জ্ঞানেশ কুমার সরলেই কি সমস্যা সমাধান হবে ?

ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা আন্দোলন। আন্দোলন শুরুর আগে সকাল হতেই ধরপাকড় শুরু করে দিয়েছে পুলিশ। ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলন রোখার চেষ্টাও চলে। দিল্লির রাস্তাঘাট থেকে মেট্রো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

জ্ঞানেশ কুমার ইস্যুতে কি বেকায়দায় মোদী সরকার? তাই কি দিল্লির আন্দোলনে রাশ টানার এত তৎপরতা। ধরপাকড় করে আন্দোলন বানচাল করার কৌশল বুমেরাং হবে না তো। তাই কি ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দাবি করেছেন তরুণ প্রজন্মকে ভয় পাচ্ছেন মোদী। সত্যিই কি তাই? সিজেপির আন্দোলন যে দিন দিন জোরদার হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে ধরপাকড় দেখে। কিন্তু প্রশ্ন যেটা উঠেছে তা হল, শুধু কি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ হলেই পরিস্থিতি বদলাবে? নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ নিয়েই যেখানে বিতর্ক সেখানে সিস্টেমের স্বচ্ছতা না আনলে কি পরিস্থিতি আদৌ বদলাবে? কে বদল আনবে সিস্টেমের?

পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়। আঠারো বছয় বয়স জানে না কাঁদা। দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমার ইস্যুতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন নিয়ে ফুটছে তরুণ প্রজন্ম। হার না মানা মানসিকতা সিজেপির। সেই লক্ষ্যে ১০ অক্টোবর যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল সিজেপি তা বানচাল করতে শনিবার সকাল থেকেই দিল্লির রাস্তায় ধরপাকড় শুরু করে দিয়েছে পুলিশ। তরুণ প্রজন্মকে আটকাতে ৪০ হাজারের বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী দিল্লিতে মোতায়েন করা হয়। সকাল হতেই শুরু হয় ধরপাকড়। ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলন রোখার চেষ্টাও চলে। দিল্লির রাস্তাঘাট থেকে মেট্রো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আকাশপথে দিল্লি আসার সময় বিমানেই আটক করা হয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে।



শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হলেও আন্দোলন চলবে বলে বার্তা দেয় সিজেপি। পুলিশের এই প্রস্তুতিকে কটাক্ষ করে দীপকে-র বার্তা, নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই কি নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ যুদ্ধ ঘোষণা করতে চান? জ্ঞানেশ কুমার ওঁদের এতই প্রিয় যে, দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে হচ্ছে? দীপকে-র দাবি, এর পর বিজেপিকে আর কেউ ভোট দেবেন না, সেই ভয়ে আছেন মোদী-শাহ। কিন্তু এত কিছুর পরেও প্রশ্নটা উঠছে, এত আন্দোলন এত যুদ্ধ কি শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে। জ্ঞানেশ কুমার সরলেই কি সমস্যা সমাধান হবে। নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ নিয়েই তো বিতর্ক তুঙ্গে। মামলা ঝুলছে শীর্ষ আদালতে। একটা জ্ঞানেশ কুমার গেলে আরেক জ্ঞানেশ আসতে কতক্ষণ। কারণ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতার সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেলের সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি মুখ্য ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করেন। তাহলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিচারে কেন্দ্রীয় সরকারই শেষ কথা। তাই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে তাঁদের পছন্দের লোক আনতে কতক্ষণইবা লাগবে। এই প্রশ্নটা তুলেছেন প্রশান্ত কিশোর। তিনি কয়েকদিন আগেই সিস্টেম বদলের দাবি তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ টেনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন নির্বাচনের কমিশনের গলদ কোথায়?



আরেকটি বিষয় খুবই স্পষ্ট আজ জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের আগে যিনি ছিলেন সেই রাজীব কুমারকে কি সবাই ভুলে গেছেন। রাজীব কুমার হলেন ১৯৮৪ র ব্যাচের একজন প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক। ২০২২ সালের ২৫ মে তিনি ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। তার আগে ২০২০ সালে পয়লা সেপ্টেম্বর তিনি একজন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে যোগ দিয়েছিলেন। তার প্রায় দু-বছরের মাথায় দেশে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে বসেন রাজীব কুমার। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন রাজীব কুমার। তাঁর নেতৃত্বেই হয়েছিল সেই নির্বাচন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক-এর পার্ট-টাইম ও নন এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। রাজীব কুমারও বিতর্কের বাইরে নন। তাঁর বিরুদ্ধেও উঠেছে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ। খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি সোশ্যাল মাধ্যমে একটি পোস্ট করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন। বিরোধীদের দাবি স্নেহধন্য রাজীব কুমার অবসর নেওয়া পর পুরস্কার স্বরূপ এত বড় পদ পেয়েছেন। জ্ঞানেশ কুমারও হয়তো আরও পদ পাবেন। তাই শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্কের অবসান হবে না।

যদিও ককরোচ জনতা পার্টির দাবি করেছে শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ নয়। তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক তদন্ত বা মামলা শুরু করার দাবি জানানো হয়েছে। স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা এবং বর্তমানে সব ধরনের আসন্ন নির্বাচন স্থগিত রাখার দাবি তোলা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভোটার তালিকা পুনরায় বহাল করার দাবি তোলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের প্রণীত আইন অবিলম্বে বাতিল করার দাবি তুলেছে সিজেপি। এই দাবি গুলি পূরণ হলেই তবেই আন্দোলন থামবে। এমনটাই বার্তা সিজেপির। তরুণ প্রজন্মের এই হার না মানা মানসিকতাকে হাতিয়ার করে দেশের বিরোধীরাও এককাট্টা। ইন্ডিয়া জোটও চরম বিরোধীতার সলতে পাকিয়েছে। এখন দেখার ককরোচদের আন্দোলনে কতটা বেসমাল হয় মোদী সরকার।