দিল্লির আন্দোলনের সমর্থনে বাংলাদেশের নাহিদ ইসলাম!

দিল্লির রাজপথে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা, ধরপাকড়, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন। আর সেই আন্দোলনের আঁচ এবার পৌঁছে গেল সীমান্তের ওপারেও। ভারতের তরুণদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিলে বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম। এক্স হ্যান্ডলে দীর্ঘ পোস্ট করে শুধু সমর্থনই নয়, ভারতের গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আন্দোলনকারীদের অধিকার নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে সিজেপি। সেই আন্দোলন ঘিরে পুলিশি ধরপাকড়ের সমালোচনা করে দীর্ঘ পোস্ট করেছেন নাহিদ। একই সঙ্গে ভারতের কাছে একাধিক দাবিও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই অবস্থান ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক মহলে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

দিল্লিতে ১০ অক্টোবর, শনিবার, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং SIR প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু মানুষের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এই ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের NCP নেতা নাহিদ ইসলাম। ১০ অক্টোবর ঢাকায় প্রকাশিত তাঁর বার্তায় ভারতের তরুণদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইকে সমর্থন জানানো হয়েছে।

নাহিদ ইসলামের পোস্টের মূল বক্তব্য ভারতের তরুণদের এই লড়াই শুধু তাঁদের একার নয়। গণতান্ত্রিক অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের লড়াইও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। নিজের বার্তায় তিনি লেখেন, ভারতের তরুণদের নির্বাচনী জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তাঁরা দৃঢ়ভাবে পাশে রয়েছেন। দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী, আন্দোলনের সংগঠক এবং সাংবাদিকদের আটক করার অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং যন্তর মন্তরে বিধিনিষেধ জারির মতো পদক্ষেপকে মৌলিক স্বাধীনতার উপর আঘাত বলে মন্তব্য করেন।

নাহিদ ইসলামের বার্তার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করিয়েছেন বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা। সেই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ থেকে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। নাহিদ ইসলাম নিজেও সেই ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ফলে দিল্লির আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তায় বাংলাদেশের সেই অভিজ্ঞতার উল্লেখ বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। নিজের পোস্টে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন কীভাবে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে দেশজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল, তা তাঁরা নিজেরা প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেই ভারতের তরুণদের লড়াইকে একা না ভাবার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের পোস্টে শুধু রাজনৈতিক সমর্থনের বার্তা নেই। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট দাবিও জানিয়েছেন তিনি।প্রথমত, আন্দোলনের সংগঠকদের কোথায় রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করতে হবে এবং তাঁদের আটক করার আইনি ভিত্তি জানাতে হবে।দ্বিতীয়ত, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের বিরোধিতা করা বা নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে যেন অপরাধ হিসেবে দেখা না হয়, সেই বক্তব্যও উঠে এসেছে তাঁর বার্তায়।

তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের ভয় দেখানো কিংবা তাঁদের কাজের সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করার মতো ঘটনা থেকে বিরত থাকতে হবে বলে দাবি করেছেন তিনি। এই বক্তব্য সামনে আসছে এমন এক সময়ে, যখন দিল্লিতে ১০ অক্টোবরের আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের খবর সামনে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যন্তর মন্তরে প্রবেশে বাধা ও কড়া নিরাপত্তার কারণে আন্দোলনকারীদের একাংশ দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দেখানোর চেষ্টা করেন।

এখানেই নাহিদের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব। ভারতের অভ্যন্তরীণ একটি নির্বাচন-সংক্রান্ত বিতর্ককে তিনি নাগরিক স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। শুধু SIR নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়েও বার্তা নাহিদ ইসলামের পোস্টের আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তিনি ভারতের আন্দোলনকে শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে কর্তৃত্ববাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, ধর্মীয় আধিপত্য এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। তিনি এমন একটি দক্ষিণ এশিয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, যেখানে ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কারও অধিকার খর্ব হবে না। পোস্টে তিনি শরজিল ইমাম এবং উমর খালিদের মতো ভারতীয় তরুণদের দীর্ঘদিন ধরে বিচার ছাড়া বন্দি থাকার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের এবং অন্যান্য তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের সংগ্রামকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

দিল্লির রাস্তায় সিজেপির আন্দোলন। একদিকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি, অন্যদিকে SIR-সহ ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন। সেই আবহেই বাংলাদেশের নাহিদ ইসলামের এক্স পোস্ট ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কাছে এই বিতর্ক শুধু একটি দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রশ্ন নয় এটা গণতান্ত্রিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার জবাবদিহির প্রশ্নও। কিন্তু নাহিদ ইসলামের এই সমর্থন ভারতের আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে কতটা প্রভাবিত করবে? নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের কী পরিণতি হবে? আর SIR নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলির জবাব কি মিলবে তথ্য ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে?