দিল্লির রাজপথে আন্দোলন, পুলিশের ধরপাকড়, ব্যারিকেডের সামনে স্লোগান আর সেই আন্দোলনের ভিড়েই বারবার উঠে আসছে একটি নাম। নেহা বোরা। কখনও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কখনও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে প্রশ্ন, কখনও আবার ছাত্র আন্দোলনের মঞ্চে সরব এই তরুণী।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
কিন্তু কে এই নেহা বোরা? কেনই বা হঠাৎ জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি? কী নিয়ে পড়াশোনা করছেন? কোন রাজ্যের বাসিন্দা নেহা? আর ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-র আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই বা কী? ২৯ বছর বয়সি নেহা বোরা শুধু একজন আন্দোলনকারী নন। তিনি দেশের অন্যতম পরিচিত বামপন্থী ছাত্র সংগঠন AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক। NEET-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে আন্দোলন থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ একাধিক প্রতিবাদে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে সংবাদ শিরোনামে নিয়ে এসেছে।
নেহা বোরার পরিচয়ের শুরুটা বুঝতে গেলে ফিরে যেতে হবে তাঁর শিক্ষাজীবনে। নেহার বেড়ে ওঠা উত্তরাখণ্ডে। তাঁর জন্ম উত্তরাখণ্ডের খতিমায়। বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে একাধিক জায়গায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে আসেন নেহা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর দিল্লির আম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরের পড়াশোনা করেন। তাঁর পড়াশোনার বিষয় ছিল পারফরম্যান্স স্টাডিজ। এরপর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিক্সে থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ নিয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন।
অর্থাৎ, নেহা শুধুমাত্র রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নন। তিনি একজন গবেষকও। তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে থিয়েটার, অভিনয় এবং মানুষের সামাজিক অভিজ্ঞতা বোঝার চর্চা। আর এখানেই রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।নেহার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন মানুষের জীবন, তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ২০১৯-২০ সালের সেই আন্দোলনের সময়ই ছাত্র রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ে। ধীরে ধীরে পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন নেহা।
এবার আসা যাক নেহার রাজনৈতিক পরিচয়ে। তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং CPI(ML) LIBERATION-এর ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে সংগঠনটি আন্দোলন করে থাকে।
তবে নেহার পরিচিতি শুধু সংগঠনের পদে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ, বক্তৃতা এবং পুলিশের হাতে আটক হওয়ার মতো ঘটনাও তাঁকে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বিশেষ করে চলতি বছরের পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে আন্দোলনে নেহার ভূমিকা তাঁকে জাতীয় স্তরে পরিচিত করে তোলে। এরপর নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে দিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তাঁর সক্রিয়তা আরও একবার তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
নেহা বোরার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্র বিক্ষোভ। NEET-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন নেহাও। যন্তর মন্তরে পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় নেহা টানা ২৩ দিন অনশন করেছিলেন। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল, পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের দায় নিয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
দীর্ঘদিন অনশন করার ঘটনা নেহাকে ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ করে তোলে। তাঁর বক্তৃতার বিভিন্ন অংশ সোশ্যাল মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। এই পর্ব থেকেই নেহার রাজনৈতিক পরিচিতি আরও বাড়তে থাকে। শিক্ষা, পরীক্ষা এবং চাকরির সুযোগ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য রাখতে দেখা যায় তাঁকে।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের মধ্যে দিল্লিতে আন্দোলনের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি । এই আন্দোলনে AISA-সহ একাধিক ছাত্র সংগঠন এবং বিভিন্ন কর্মী সংগঠনও সক্রিয় ভূমিকা নেয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে এই বিতর্কের একদিকে রয়েছে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অন্যদিকে কমিশনের বক্তব্য ও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
এই আন্দোলনে নেহা বোরার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের পৌঁছনো আটকে দেওয়া হলে, বিকল্প জায়গায় প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় দিল্লি হাটকে নতুন প্রতিবাদের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করার ডাক দেন নেহা। পরে পুলিশের হাতে আটক হন তিনি এবং অন্যান্য আন্দোলনকারীরা। আটক হওয়ার পরেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন নেহা। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাই তাঁকে আরও বেশি করে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের নজরে নিয়ে আসে। অর্থাৎ, নেহার ভূমিকা বুঝতে গেলে তাঁকে শুধু একটি আন্দোলনের মুখ হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি বৃহত্তর ছাত্র রাজনীতির একজন সংগঠক, যিনি বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
উত্তরাখণ্ডে বেড়ে ওঠা, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, আম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর, JNU-তে গবেষণা এই পথ পেরিয়ে নেহা বোরা এখন ছাত্র রাজনীতির একটি পরিচিত নাম। CAA-বিরোধী আন্দোলন থেকে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, ২৩ দিনের অনশন থেকে দিল্লির SIR-বিরোধী বিক্ষোভ তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় একাধিক অধ্যায় রয়েছে।