দেশের গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা, সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই এবার সামনে এল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরাসরি চিঠি না লিখে, দুই নির্বাচন কমিশনার কেন চিঠি লিখেছিলেন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবকে? সেই চিঠিতে ঠিক কী অভিযোগ জানানো হয়েছিল? কী পদক্ষেপ করেছিল ক্যাবিনেট সচিবালয়? আরটিআই বা তথ্যের অধিকার আইনে সামনে এসেছে চিঠি আদানপ্রদানের সরকারি নথি। কিন্তু সেই নথি সামনে আসতেই কি রহস্যের সমাধান? নাকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অধরা?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
একদিকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা সংশোধন, SIR এবং ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া নিয়ে একের পর এক অভিযোগ। অন্যদিকে, এবার সামনে এল নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই মতবিরোধের নতুন তথ্য। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি চিঠি না লিখে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবের দ্বারস্থ হয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। কিন্তু কেন? কী এমন ঘটেছিল নির্বাচন কমিশনের অন্দরে, যার জেরে দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকের কাছে চিঠি পাঠাতে হয়েছিল তাঁদের?
তথ্য জানার অধিকার আইন বা RTI-তে পাওয়া উত্তরে নিশ্চিত হয়েছে, দুই কমিশনারের চিঠি ক্যাবিনেট সচিবালয়ে পৌঁছেছিল এবং পরে সেগুলি সংশ্লিষ্ট দফতর ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অফিসে পাঠানো হয়েছিল। তবে চিঠির সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন একাধিক প্রশ্ন। ঠিক কী নিয়ে আপত্তি ছিল? আর এই চিঠি কি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ, নাকি নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিকের কাজের বণ্টন নিয়ে প্রশাসনিক বিরোধ? জেনে নেওয়া যাক পুরো ঘটনা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই। নির্বাচন কমিশনের অন্দরে কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে একটি নির্দেশ জারি হয়। সেই নির্দেশ ঘিরেই আপত্তি ওঠে। পরের দিন, অর্থাৎ ২৯ জুলাই, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী পৃথকভাবে চিঠি লেখেন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবকে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তাঁরা সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লেখার বদলে ক্যাবিনেট সচিবের কাছে যান। সূত্রের খবর, এই কাজের নির্দেশ নিয়ে আপত্তির কেন্দ্রে ছিলেন নির্বাচন কমিশনে ডেপুটেশনে কর্মরত এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক। এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তথ্য জানার অধিকার আইন বা RTI। ইন্ডিয়া টুডে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর এই বিষয়ে RTI আবেদন করা হয়েছিল। ১৯ অক্টোবর সেই আবেদনের জবাব আসে। তাতে নিশ্চিত হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি ক্যাবিনেট সচিবালয়ে পৌঁছেছিল।
নথি অনুযায়ী, ৩০ জুলাই চিঠি দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়। এরপর ৫ অগাস্ট ক্যাবিনেট সচিবালয় সংশ্লিষ্ট কর্মীবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতর এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দফতরে চিঠি ও সংশ্লিষ্ট নথি পাঠায়। কিন্তু এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। RTI-র উত্তরে চিঠির সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। এবার আসা যাক আরও বড় প্রশ্নে। এই চিঠি ঘিরে বিতর্ক কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? এর আগে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত প্রায় ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি তুলেছিলেন সান্ধু ও যোশী।প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই আপত্তিগুলির মধ্যে ছিল ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া, ফর্ম-৬ সংক্রান্ত পরিবর্তন, ভোটার তালিকার সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনী তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন। কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের অজ্ঞাতে নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও আপত্তি ওঠে। এই বিতর্কে নির্বাচন কমিশনও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিবৃতিতে কমিশন জানায়, ক্যাবিনেট সচিবকে লেখা চিঠি কমিশনের কোনও নীতিগত বিষয় বা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নীতিনির্ধারণ নিয়ে ছিল না। বরং নির্বাচন কমিশনে ডেপুটেশনে কর্মরত এক আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে বিষয়টি ছিল।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আধিকারিকের জারি করা কাজের দায়িত্ব বণ্টনের নির্দেশ দুই কমিশনারের হস্তক্ষেপের পর বাস্তবায়িত হয়নি। কমিশন আরও জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর নজরদারির দায়িত্ব বাস্তবে প্রত্যাহার করা হয়নি। অর্থাৎ, একদিকে দুই কমিশনারের চিঠি ও কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের দাবি-সংশ্লিষ্ট নির্দেশ কার্যকরই হয়নি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নজরদারিও অক্ষুণ্ণ ছিল। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তা আরও স্পষ্ট করতে চিঠি ও ফাইলের সম্পূর্ণ নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুই নির্বাচন কমিশনার কেন ক্যাবিনেট সচিবের দ্বারস্থ হয়েছিলেন? কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আপত্তি ঠিক কতটা গুরুতর ছিল? চিঠিতে কোন আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল? আর এই প্রশাসনিক বিরোধের সঙ্গে ভোটার তালিকা ও SIR নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের সম্পর্ক কতটা?
আপাতত এটুকুই স্পষ্ট নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি লিখেছিলেন এবং সেই চিঠি নিয়ে সরকারি দফতরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলেছিল। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কমিশনের অন্দরে মতবিরোধ থাকলে তার প্রকৃত কারণ জানা জরুরি। এই চিঠির পিছনে ঠিক কী ছিল-প্রশাসনিক বিরোধ, নাকি তার চেয়েও বড় কোনও প্রশ্ন সেটাই এখন দেখার। দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি-তারিখ ২৯ জুলাই। সরকারি নথিতে নথিভুক্ত ৩০ জুলাই। ৫ অগাস্ট ক্যাবিনেট সচিবালয়ের পদক্ষেপ। আরটিআইয়ের জবাবে নিশ্চিত হল চিঠির অস্তিত্ব এবং তার প্রশাসনিক গতিপথ। কিন্তু চিঠির ভিতরে কী লেখা ছিল, কেন এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ-সেই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও সম্পূর্ণ নয়। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য একদিকে, আরটিআইয়ে সামনে আসা নথি অন্যদিকে। এখন অপেক্ষা মূল নথির। কারণ, গণতন্ত্রে শুধু সিদ্ধান্ত নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। আর সেই স্বচ্ছতার প্রশ্নেই আপাতত নজর নির্বাচন কমিশনের এই চিঠি-বিতর্কে।