একদিকে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে তাঁকে দেশে ফেরানোর প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ঢাকা।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যখন নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, শেখ হাসিনাকে কোনও সাধারণ যাত্রীর মতো পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস দিয়ে বাংলাদেশে ফেরানোর প্রশ্নই ওঠে না। বরং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কার্যকর থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে হস্তান্তর করতে হবে। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক সন্ত্রাসী’ বলেও আক্রমণ করেছেন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী। তাঁর এই মন্তব্যে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও একবার প্রকাশ্যে চলে এল।
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবীর। বাংলাদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে যাচ্ছিলেন চিনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় জানানোর পরই সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেই সময় শেখ হাসিনার পাসপোর্ট কিংবা ট্রাভেল পাস পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। উত্তরে কার্যত ক্ষোভ প্রকাশ করে হুমায়ুন কবীর জানান, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর জন্য কোনও সাধারণ ভ্রমণ নথির প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের কাছে ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তি অনুযায়ীই তাঁকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাবে ঢাকা।
এখানেই থেমে থাকেননি বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী। শেখ হাসিনাকে সাধারণ কোনও বাণিজ্যিক যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং যাঁর বিরুদ্ধে আদালতের সাজা ঘোষণা হয়েছে, তাঁকে সাধারণ যাত্রীর মতো দেশে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তাঁকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। এই প্রসঙ্গেই অত্যন্ত কটাক্ষের সুরে হুমায়ুন কবীর বলেন, শেখ হাসিনা কি রংপুরে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসবেন যে তাঁকে পাসপোর্ট দেওয়া হবে? তাঁর কথায়, অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় আইনি প্রক্রিয়া ও প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা।
কিন্তু কেন হঠাৎ শেখ হাসিনার পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের প্রসঙ্গ উঠল? আসলে, ভারতের দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। যদিও দেশে ফেরার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ তিনি জানাননি। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও আদালতের রায়ের বিষয়টি সামনে রেখেই এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেছেন কি না সেই প্রশ্নও ওঠে। সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ুন কবীর জানান, তিনি সদ্য অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠক থেকে দেশে ফিরেছেন। ফলে শেখ হাসিনা পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের জন্য কোনও আবেদন করেছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে তখনও নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। তবে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, পাসপোর্ট দেওয়ার প্রসঙ্গটাই তাঁর কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিমধ্যেই আইনি পথ খোলা রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে ব্যাপক বলপ্রয়োগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনায় আদালত। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই এই রায় ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও চলছে।
এই মামলার গুরুত্ব বোঝাতে জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের প্রকাশিত প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্ট মাসে বাংলাদেশের আন্দোলন এবং তার পরবর্তী হিংসার ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। যদিও শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। মৃত্যুর সংখ্যা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবীরা। ফলে এই মামলাকে ঘিরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। সেই দাবির ভিত্তি হিসেবে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির কথাই তুলে ধরছে ঢাকা। বাংলাদেশের তরফে এ নিয়ে একাধিকবার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিবেচনা করা হবে। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি এখন আর শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, বরং দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য। দুই ঘটনাকে ঘিরেই নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। একদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের কথা বলছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকার চাইছে, তাঁকে ভারতের কাছ থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হস্তান্তর করা হোক। অর্থাৎ, প্রত্যাবর্তনের পথ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। শেখ হাসিনার বক্তব্যে যেখানে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে, সেখানে ঢাকার অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। তাঁকে সাধারণ ভ্রমণকারীর মতো দেশে ফেরানো নয়, বরং আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। শেখ হাসিনাকে কি শেষ পর্যন্ত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে ভারত। নাকি ডিসেম্বরেই নিজের ঘোষণামতো দেশে ফিরবেন বাংসাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। গোটা পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয় এখন সেদিকেই নজর।