বাজারে নতুন iPhone বা Samsung-এর ফ্ল্যাগশিপ ফোন এলেই কি আপনারও মনে হয়, পুরনো ফোনটা এবার বদলে ফেলা দরকার? নতুন ক্যামেরা, আরও দ্রুত প্রসেসর, AI-এর একগুচ্ছ ফিচার- বিজ্ঞাপনে সবই আকর্ষণীয়। কিন্তু সত্যিই কি প্রতি বছর ফোন বদলানোর মতো বড় পরিবর্তন আসে?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক স্মার্টফোনে এক বছর থেকে পরের বছরের উন্নতি অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। অথচ নতুন ফ্ল্যাগশিপ ফোন কিনতে খরচ হতে পারে ৮০ হাজার থেকে দেড় লক্ষ টাকা বা তারও বেশি। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রতি বছর ফোন বদলানোর পিছনে এত টাকা খরচ করা কি আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ? সেই টাকা বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে কতটা সম্পদ তৈরি হতে পারে?
প্রতি বছর ফোন বদলানো কি জরুরি?
প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রতি বছরই নতুন স্মার্টফোন বাজারে আসে। সংস্থাগুলি দাবি করে, নতুন মডেলে রয়েছে আরও উন্নত ক্যামেরা, দ্রুত প্রসেসর এবং আধুনিক AI ফিচার। কিন্তু বাস্তবে দৈনন্দিন ব্যবহারে এই পরিবর্তনের সবটা কি বোঝা যায়? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আগের বছরের ফ্ল্যাগশিপ ফোনের সঙ্গে নতুন মডেলের পার্থক্য খুব বেশি নয়। ফোনের গতি, ডিসপ্লে কিংবা সাধারণ ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন অনেক সময় চোখে পড়ার মতো হয় না। অর্থাৎ, নতুন ফোনে কিছু উন্নতি থাকলেও পুরনো ফোনটি যদি ভালোভাবে কাজ করে, তাহলে শুধুমাত্র নতুন মডেল এসেছে বলে সেটি বদলানোর প্রয়োজন নেই।
ফোন কেনার খরচ, সঙ্গে মূল্যহ্রাস
এবার আসা যাক খরচের হিসাবের দিকে। একটি প্রিমিয়াম iPhone বা Samsung ফোন কিনতে খরচ হতে পারে ৮০ হাজার টাকা থেকে দেড় লক্ষ টাকা বা তারও বেশি। কিন্তু ফোন কেনার পর থেকেই তার বাজারমূল্য কমতে শুরু করে। নতুন মডেল বাজারে এলে পুরনো ফোনের রিসেল ভ্যালু আরও কমতে পারে। অর্থাৎ, প্রতি বছর ফোন বদলালে শুধু নতুন ফোন কেনার খরচই নয়, পুরনো ফোন বিক্রির সময়ও মূল্যহ্রাসের ধাক্কা সামলাতে হয়। তাই আর্থিক দিক থেকে প্রতি বছর ফোন বদলানো অনেকের জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ হয়ে উঠতে পারে।
ফোনের বদলে বিনিয়োগ করলে কত টাকা হতে পারে?
ধরুন, আপনি নতুন ফোন কেনার জন্য রাখা দেড় লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলেন। এবার একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। যদি বছরে গড়ে ১২ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যায়, তাহলে চক্রবৃদ্ধি হারে পাঁচ বছর পর দেড় লক্ষ টাকা বেড়ে হতে পারে প্রায় ২ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা। আর দশ বছর পর সেই অঙ্ক পৌঁছতে পারে প্রায় ৪ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকায়। তবে মনে রাখবেন, ১২ শতাংশ রিটার্ন এখানে শুধুই একটি অনুমান। মিউচুয়াল ফান্ড বা বাজারভিত্তিক বিনিয়োগে কোনও নির্দিষ্ট রিটার্ন নিশ্চিত নয়। বাজারের ওঠানামায় প্রকৃত লাভ বা ক্ষতির পরিমাণ বদলে যেতে পারে। তবুও এই হিসাব দেখায়, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দিকে নজর দিলে সম্পদ তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।
কত বছর পর ফোন বদলানো উচিত?
তাহলে কতদিন একটি ফোন ব্যবহার করা উচিত? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফোন ভালোভাবে কাজ করলে এক বছর অন্তর বদলানোর বদলে তিন থেকে চার বছর ব্যবহার করার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। ভারতে স্মার্টফোন বদলানোর গড় সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে গেলে বা পারফরম্যান্স কমে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন ফোন কেনার দরকার নেই। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টার থেকে ব্যাটারি বদলে নিলেই ফোনের ব্যবহারযোগ্যতা অনেকটা ফিরে আসতে পারে।
নতুন ফোন কিনলেও কীভাবে সাশ্রয় করবেন?
যাঁদের নতুন ফোন কেনার প্রয়োজন রয়েছে, তাঁদের জন্যও রয়েছে কয়েকটি উপায়। প্রথমত, সদ্য লঞ্চ হওয়া মডেলের বদলে আগের বছরের ফ্ল্যাগশিপ ফোন কেনার কথা ভাবতে পারেন। যেমন Samsung Galaxy S25-এর মতো পুরনো ফ্ল্যাগশিপ মডেল। দ্বিতীয়ত, সব সময় প্রিমিয়াম ফোন কেনার প্রয়োজন নেই। Samsung Galaxy A56-এর মতো মিড-রেঞ্জ ফোনও অনেক সাধারণ ব্যবহারকারীর প্রয়োজন মেটাতে পারে। তৃতীয়ত, পুরনো ফোন বিক্রি বা এক্সচেঞ্জ করার আগে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাম যাচাই করুন। iPhone সাধারণত অনেক Android ফ্ল্যাগশিপের তুলনায় ভালো রিসেল ভ্যালু ধরে রাখতে পারে, যদিও মডেল, ফোনের অবস্থা ও বিক্রির সময় অনুযায়ী দাম বদলায়। আর চতুর্থত, নতুন ফোন কেনার পরিকল্পনা থাকলে উৎসবের মরশুম বা বড় অনলাইন সেলের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন। সেই সময় ব্যাঙ্ক অফার, এক্সচেঞ্জ বোনাস এবং ছাড় মিলিয়ে খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, প্রতি বছর নতুন iPhone বা Samsung কেনা কোনও বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। আপনার বর্তমান ফোনটি যদি ঠিকঠাক কাজ করে, তাহলে সেটি আরও কয়েক বছর ব্যবহার করাই আর্থিকভাবে বেশি লাভজনক হতে পারে। ফোনের ব্যাটারি বদলানো, পুরনো ফ্ল্যাগশিপ কেনা কিংবা বড় সেলের জন্য অপেক্ষা করা- এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তেই সাশ্রয় হতে পারে হাজার হাজার টাকা। আর সেই সাশ্রয় করা অর্থ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কাজে লাগালে ভবিষ্যতে সম্পদ তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে। তাই নতুন ফোন কেনার আগে একবার ভাবুন- সত্যিই কি ফোনটি বদলানো জরুরি, নাকি শুধু নতুন মডেলের আকর্ষণেই খরচ করতে চলেছেন?