দুর্গাপুজো মানেই তো বাঙালিদের কাছে একটা আবেগ। শুধু চার দিনের উৎসব নয়। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু পুজো রয়েছে, যেগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস, পারিবারিক পরম্পরা আর এমন কিছু প্রাচীন রীতি যা আজও বদলে যায়নি। আসানসোলের এথোরা গ্রামের চক্রবর্তী ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো তেমনই এক ঐতিহ্যের সাক্ষী। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এই পুজো স্থানীয় মানুষের কাছে বড় দুর্গা পুজো নামে পরিচিত। আর এই পুজোর বিশেষত্ব শুরুই হয় মহালয়ার অনেক আগে। দুর্গাপুজোর প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই এখানে শুরু হয়ে যায় দেবীর আরাধনা।

ছোটন সেনগুপ্ত, নিজস্ব সংবাদদাতা
কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে দেবীর কল্পারম্ভ ও বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই প্রাচীন পুজো। অর্থাৎ যখন অধিকাংশ জায়গায় দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি চলছে, তখন এথোরা গ্রামের এই মন্দিরে শুরু হয়ে যায় দেবীর আনুষ্ঠানিক আরাধনা। বোধনের পর টানা ১৫ দিন ধরে দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। দীর্ঘ এই পুজোর প্রতিটি পর্বেই রয়েছে পুরনো রীতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ছাপ।
এখানকার আরও একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল এই পুজোয় বাইরের কোনও পুরোহিতকে আনা হয় না। চক্রবর্তী ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের পারিবারিক রীতি মেনে দেবীর পুজো করে আসছেন। এমনকী পুজোর মন্ত্রও সাধারণ কোনও ছাপানো বই থেকে নয়, তালপাতার পুঁথিতে লেখা প্রাচীন মন্ত্র অনুসরণ করেই পাঠ করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে, পুজোর আয়োজনের ধরনও অনেক জায়গায় বদলেছে কিন্তু এথোরার বড় দুর্গার পুজোয় সেই পুরনো পুঁথি আর পারিবারিক নিয়ম এখনও নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে। শুধু পুরোহিত বা পুজোর মন্ত্রেই নয়, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও বহু মানুষ রয়েছেন যাঁদের সম্পর্কও চলে আসছে বংশ পরম্পরায়। প্রতিমাশিল্পী, ঢাকি থেকে শুরু করে নাপিত,প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের মানুষ এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে এটি শুধুমাত্র একটি পরিবারের দুর্গাপুজো নয় বরং গোটা গ্রামের একাধিক পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে উঠেছে। পরিবারের সদস্য ও পুরোহিত অমিতাভ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, দুর্গাপুজোর প্রায় ১৫ দিন আগে কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে দেবীকে ভোগ নিবেদন হয়। এরপর টানা ১৫ দিন ধরে দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়।
এই পুজোর বলির রীতিও অত্যন্ত প্রাচীন বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। নবমীর দিন রয়েছে মহিষ বলির রীতি। বলির আগে রয়েছে আরও একটি বিশেষ আচার, যা এই পুজোকে অন্য অনেক পুজোর থেকে আলাদা করে দেয়। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, অষ্টমীর সন্ধিপুজো শেষ হওয়ার পর বন্দুক দাগার প্রথা রয়েছে। বন্দুকের আওয়াজের পর শুরু হয় বলিদান।
পুজোর শেষে এখানকার বিসর্জনও হয় সাবেকি রীতিতেই। একচালার প্রতিমা কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হয় নিরঞ্জনের জন্য। কোনও চাকচিক্য নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয় বিসর্জনের পর্ব। দেবীর বিদায়ের সেই মুহূর্তেও যেন ফিরে আসে কয়েকশো বছরের পুরনো দিনের ছবি। এথোরা গ্রামের বড় দুর্গার পুজোকে ঘিরে সেই পুরনো টান আজও অটুট। কৃষ্ণপক্ষের নবমীর বোধন থেকে শুরু করে টানা ১৫ দিনের ভোগ, তালপাতার পুঁথির মন্ত্র, বংশপরম্পরার পুরোহিত, শিল্পী ও ঢাকি, সন্ধিপুজোর পর বন্দুক দাগার প্রথা, বলিদান এবং শেষে কাঁধে করে সাবেকি প্রতিমার নিরঞ্জন। সব মিলিয়ে এই পুজো যেন বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক টুকরো ইতিহাসকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে।