ককরোচের কামড়ে ব্যাকফুটে কেন্দ্র?

জেপি নাড্ডার হাতে স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হয় সিজেপির তরফে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ চলো অভিযানের পরই কী কিছুটা ব্যাকফুটে কেন্দ্রীয় সরকার? কিন্তু কেন এই ব্যাকফুটের তত্ত্ব উঠে আসছে? এর পিছনে রয়েছে মূলত দুটি কারণ।
এক, ৬ জুন থেকে টানা দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি নিজেদের বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের কর্মসূচিতে লাদাখের সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক যোগ দিতেই আন্দোলন যেন অন্য মাত্রা পায়। তার উপর সোনাম ওয়াংচুক যতদিন না পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে ইস্তফা দিচ্ছেন মূলত সেই দাবিকে সামনে রেখে আমরণ অনশন শুরু করেন। ফলে দেশের ছাত্র-যুব সমাজের কাছে ককরোচের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়।

গত শনিবার কার্যত হাইজ্যাক করে সোনাম ওয়াংচুককে অনশনস্থল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে দিল্লি পুলিশ। তবে তাতেও ককরোচদের সোমবার সংসদ ভবন অভিযান কর্মসূচিকে রোখা যায়নি। প্রায় ২০ হাজার পড়ুয়ার পাশাপাশি সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলী আংমো, চলচ্চিত্র তারকা, বিজেপি বিরোধী দলের সাংসদরা তাদের কর্মসূচিতে যোগ দেন। তার থেকেও বড় কথা কেন্দ্র এতদিন পর্যন্ত ককরোচদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না চাইলেও সোমবার দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জেপি নাড্ডা প্রায় ১০ মিনিট বৈঠক করেন ককরোচ জনতা পার্টির দুই প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে। জেপি নাড্ডার হাতে স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হয় সিজেপির তরফে।

দুই, কেন্দ্র-সিজেপি সাক্ষাৎ নিয়ে যখন গোটা দেশে গুঞ্জন তখন মঙ্গলবার আরও বড় চমক দেখা গেল। ৩ মে নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর থেকে বিরোধীদের বারবার অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবিষয়ে চুপ করে রয়েছেন। তবে নিট প্রশ্নফাঁস বা পুনঃপরীক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কখনই মুখ খোলেননি বলে দাবি বিরোধীদের। মঙ্গলবার টুইস্টটা সেখানেই। নিট প্রশ্ন এইভাবে ফাঁস হওয়া ঘোরতর অন্যায় বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তবে তিনি এও বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সরকার পদক্ষেপ করেছে। ১৩ জন অভিযুক্তকে ইতিমধ্যেই জেলে পাঠানো হয়েছে। এনডিএ সংসদীয় দলের মঙ্গল মিলন বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে এ কথা জানান। বলেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি সাংসদদের বার্তাও নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের উস্কানি দেবেন না, ওদের সঠিক পথ দেখান।

সোমবার, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকে বসেন সিজেপির প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। বৈঠকের পরেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ ককরোচ জনতা পার্টি। শুধু তাই নয়, সোনাম ওয়াংচুকও জানিয়ে দেন, হাসপাতালে তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন। সিজেপি আরও জানিয়েছে, সরকারের কাছে তারা মূলত তিনটি দাবি জানিয়েছে। সেই দাবি পূরণ না-হওয়া পর্যন্ত তারা যেভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল, তেমনই চলবে। সোমবার বিকালে প্রায় দু-ঘন্টা অপেক্ষার পর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জেপি নাড্ডার কাছে স্মারকলিপি তুলে দেন সিজেপি নেতৃত্ব।
শিক্ষাক্ষেত্রে চরম দুর্নীতি, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পডুয়াদের নিজেদের জীবন শেষ করে দেওয়ার মতো মারাত্মক বিষয় নিয়ে গঠিত এই ৩টি মূল দাবি ঘিরে এখন তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি।

সরকারের কাছে CJP-র ৩টি প্রধান দাবি
সোনাম ওয়াংচুকের নিঃশর্ত মুক্তিঃ
আন্দোলনকারী সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুককে কোনওপ্রকার শর্ত বা চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই অবিলম্বে হাসপাতাল ও পুলিশের হেফাজত থেকে পূর্ণাঙ্গ মুক্তি দিতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাঃ নিট ২০২৬ প্রশ্ন ফাঁস, CBSE দ্বাদশ শ্রেণীর পোর্টাল গোলযোগ এবং CUET পরীক্ষার চরম অনিয়ম ও দেরির সার্বিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে ছাঁটাই করতে হবে।

মৃতদের পরিবারকে ১ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণঃ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতির জেরে মানসিক চাপে যে সমস্ত পরীক্ষার্থী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজেদের জীবন শেষ করে দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিটি পরিবারকে সরকার থেকে ১ কোটি টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক শেষে সিজেপি প্রতিনিধি দলের তরফ থেকে এই আলোচনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সংগঠনের তরফে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে আমাদের সমস্ত অভাব-অভিযোগ ও দাবির কথা শুনেছেন। পুরো আলোচনাটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেষ সম্পন্ন হয়েছে। সিজেপি প্রতিনিধি দল দৃঢ় আশাবাদী যে সরকার আমাদের দেওয়া দাবিগুলির বিষয়ে দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

একই সঙ্গে সরকারের তরফ থেকে কোনও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ শান্ত থাকতে এবং রাজপথে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছে সিজেপি নেতৃত্ব।

শেষে একটাই কথা, এতদিন সচিব পর্যায়ের কোন ব্যক্তির সঙ্গে ককরোচরা আলোচনা করুক কেন্দ্র এমনটাই খবর ভেসে আসছিল। তবে তাতে বারবার না করে দেওয়া হয় সিজেপির তরফে। তাঁদের দাবি ছিল, কেন্দ্রীয় কোনও মন্ত্রী সঙ্গে তাঁরা সাক্ষাৎ করে নিজেদের দাবি দাওয়া পেশ করবেন। আরও হল তাই। এখন দেখার ককরোচদের দাবি মেনে নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দেবেন, নাকি নতুন কোনও নাটক অপেক্ষা করছে ?