গ্রামের সব কৃষকের ঋণ মেটালেন এক ব্যবসায়ী। ২৯০ জন কৃষকের মোট ৯০ লক্ষ টাকা ঋণ মিটিয়েছেন ওই ব্যবসায়ী।

শুভাশিস মণ্ডল, সাংবাদিক: দেশের সব শ্রেণির মানুষের খাদ্যের জোগানদাতা কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পেয়ে দিন দিন নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ধান-পাট-গম-সবজিসহ নানা ধরনের ফল, ফসলের চাষ করে অধিকাংশ সময় উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। সরকারি বিজ্ঞাপনে বড় বড় করে লেখা, ফসলের বীজ তৈরি থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সরকার কৃষকদের পাশে থাকে। কীভাবে থাকে সেটাও উল্লেখ করেছে। বিগত ১০ বছরে গম, চাল, তুলো, ডাল এবং তৈলবীজ ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কেনার জন্য ২০ লক্ষ কোটি টাকা সরকার ব্যয় করেছে। প্রশ্ন হলো, এই ব্যয়ে আদৌ চাষিরা লাভবান হয়েছেন? সে খবর কি সরকার রেখেছে? চাষিরা যদি লাভবানই হবেন তাহলে সঠিক এমএসপি নির্ধারণ ও তার আইনি স্বীকৃতির দাবিতে কেন আন্দোলন করবেন? কেনই বা তাঁরা রোদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে শম্ভু ও খানৌরি সীমান্তে গত এক বছর ধরে বসে থাকবেন? সরকার আসে, সরকার যায়, দিন বদলায় না৷ বদলায় না সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার কাহিনি৷ ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। লাখ লাখ মানুষ কৃষিজীবী। এঁদের ভিতর সম্পন্ন কৃষকের তুলনায় দরিদ্র কৃষকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এই দরিদ্র কৃষকদের হাতে নিজস্ব জমি নেই। অন্যের জমিতে কৃষিমজুর হিসেবে কাজ করে কোনওমতে দিন গুজরান করতে হয় ওঁদের। ভারতে জিডিপি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কৃষির উল্লেখযোগ্য অবদান থাকলেও কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা করুণ থেকে করুণতর হয়েছে।

সেই কৃষকদের দুরাবস্থার খবর অধিকাংশই খোঁজ রাখেন না। টিভি, সোশাল মিডিয়ায় এক ঝলক দেখে এড়িয়েই যাই আমরা অনেকে। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে ঋণে জর্জরিত গোটা গ্রামের কৃষকরদের দুরাবস্থার খবর এড়িয়ে যেতে পারেনি গুজরাতের এক ব্যবসায়ী। তিনি জানতে পেরেছেন অধিকাংশ দিনই তাঁর গ্রামের কৃষকদের কাটত হতাশা এবং উৎকণ্ঠায়। এই পরিস্থিতিতে সাক্ষাৎ দেবদূত হয়ে তাঁদের সামনে উপস্থিত হন ওই ব্যবসায়ী। গ্রামের সমস্ত কৃষকদের ঋণ মেটানোর দায়িত্ব একার কাঁধেই নেন তিনি। তাঁর এই মহৎ পদক্ষেপে কাটল গোটা গ্রামের উপরে থাকা আশঙ্কার মেঘ। জানা গিয়েছে, ২৯০ জন কৃষকের মোট ৯০ লক্ষ টাকা ঋণ মিটিয়েছেন ওই ব্যবসায়ী।

ওই ব্যবসায়ীর নাম বাবুভাই জিরাওয়ালা। তিনি গুজরাতের আমরেলি জেলার জিরা গ্রামের বাসিন্দা। সম্প্রতি মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহৎ পদক্ষেপ করেন তিনি। জানা গিয়েছে, ১৯৯৫ সাল থেকে ঋণের ভারে ন্যুব্জ ছিলেন জিরা গ্রামের কৃষকরা। সেই সময় গ্রামের কো-অপারেটিভ ঘিরে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গ্রামের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ কৃষকদের নামে প্রচুর ভুয়ো ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে, সেই ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে কৃষকরা সরকারি প্রকল্প, সহায়তা এবং ব্যাঙ্ক থেকে নতুন ঋণের নেওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হন।
জিরাওয়ালা বলেন, আমার মা যখন জীবিত ছিলেন, তখন তিনি তাঁর গয়না বিক্রি করে কৃষকদের ঋণ পরিশোধ করতে চাইতেন। তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্যই আমি এবং আমার ভাই এই পদক্ষেপ করি। ব্যাঙ্ক আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে ঋণ পরিশোধের ইচ্ছা প্রকাশ করি। ব্যাঙ্ক আমাদের সহযোগিতা করে। সমস্ত কৃষকরা তাঁদের ঋণমুক্তির শংসাপত্র পেয়ে গিয়েছেন।
মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতেও যে এইভাবে সমাজের অন্নদাতা কৃষকের পাশে দাঁড়ানো যায় তা দেখিয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ী বাবুভাই জিরাওয়ালা। আজ দেশের প্রতিটি কোনে তাঁর এই গৌরবগাঁথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। অন্নদাতাদের পাশে দাঁড়িয়ে জন্মদাত্রী মাকে উপযুক্ত ছেলের পরিচয় দিলেন বাবুভাই।