ইয়েস ব্যাঙ্কে নতুন ক্যাপ্টেন, আস্থা ফিরবে ?

২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া তিন বছরের জন্য বিনয় টোন্সের নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকেই এই মেয়াদ কার্যকর হবে। তবে এই নিয়োগ এখনও শোয়ার হোল্ডারদের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ভারতের বেসরকারি ব্যাঙ্কিং সেক্টরে আবারও বড় বদল। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অনুমোদনের পর ইয়েস ব্যাঙ্কের নতুন ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন বিনয় মুরলীধর টোন্সে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং ইয়েস ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ কৌশল ও পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ব্যাঙ্কের তরফে স্টক এক্সচেঞ্জে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া তিন বছরের জন্য বিনয় টোন্সের নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকেই এই মেয়াদ কার্যকর হবে। তবে এই নিয়োগ এখনও শোয়ার হোল্ডারদের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল। একটু পিছন ফিরে দেখলে-

২০০৩-০৪ সালে রানা কাপুর ও অশোক কাপুরের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইয়েস ব্যাঙ্ক। এরপর দ্রুত কর্পোরেট ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাঙ্কটি ভারতের অন্যতম বড় বেসরকারি ব্যাঙ্কে পরিণত হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ, শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের জেরে ২০২০ সালে ব্যাঙ্কটি মারাত্মক সংকটে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, রানা কাপুর ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিএইচএফএল ও অনিল আম্বানি গোষ্ঠীর মতো সংস্থাকে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করেন, যার বড় অংশ পরে অনাদায়ী ঋণ বা এনপিএ-তে পরিণত হয়। ২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রায় ৫,০৫০ কোটি টাকার আর্থিক তছরুপ ও দুর্নীতির অভিযোগে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট তাঁকে গ্রেফতার করে, যার পর ব্যাঙ্কের শেয়ার ধসে পড়ে এবং আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া হস্তক্ষেপ করে, টাকা উত্তোলনে সীমা আরোপ করা হয় এবং এসবিআই-এর নেতৃত্বে একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাঙ্কটিকে ধসের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ চার বছর জেল খাটার পর ২০২৪ সালের এপ্রিলে রানা কাপুর জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এখনও বিচারাধীন, আর সেই সংকটের পর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ইয়েস ব্যাঙ্ক ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোতে শুরু করে।

বর্তমানে ইয়েস ব্যাঙ্কের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন প্রশান্ত কুমার, যিনি ব্যাঙ্কের সংকটময় সময়ে দায়িত্ব নিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং নেতৃত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে নতুন নেতৃত্ব আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কে এই বিনয় মুরলীধর টোন্সে?

ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে বিনয় টোন্সের। তিনি এর আগে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে রিটেল বিজনেস ও অপারেশনস বিভাগ সামলেছেন।

২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এসবিআই-তে তাঁর দায়িত্ব ছিল। রিটেল ব্যাঙ্কিং, অপারেশন ম্যানেজমেন্ট এবং গ্রাহক পরিষেবা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ইয়েস ব্যাঙ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ব্যাঙ্কের লক্ষ্য এখন স্পষ্ট- গ্রাহকভিত্তি বাড়ানো, অপারেশনাল দক্ষতা উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই দিক থেকে টোন্সের অভিজ্ঞতা ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নেতৃত্ব পরিবর্তন?

এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইয়েস ব্যাঙ্ক ধীরে ধীরে সংকট কাটিয়ে নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ২০১৯ সালে খারাপ ঋণ, দুর্বল প্রশাসন এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে ব্যাঙ্ক গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানে একটি রেসকিউ প্ল্যানের মাধ্যমে এসবিআই-সহ একাধিক ব্যাঙ্ক বিনিয়োগ করে ইয়েস ব্যাঙ্ককে বাঁচায়।

গত কয়েক বছরে ব্যাঙ্ক তার ব্যালান্স শিট শক্তিশালী করেছে, সম্পদের গুণগত মান উন্নত হয়েছে এবং লাভজনকতায়ও ফিরেছে। ফলে এখন ইয়েস ব্যাঙ্ক নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে।

SMBC বিনিয়োগ এবং নতুন কৌশল

২০২৫ সালে আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটে, যখন জাপানের সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশন বা SMBC ইয়েস ব্যাঙ্কে প্রায় ২৪ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি ব্যাঙ্কের শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে।

এসবিআই, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক এবং আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক।
যারা রেসকিউ প্ল্যানের অংশ হিসেবে বিনিয়োগ করেছিল।
তারা ধীরে ধীরে তাদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে আসে।
কারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত লক-ইন পিরিয়ড শেষ হয়ে যায়।
ব্যাঙ্কের আর্থিক পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হয়।

SMBC-র এই বিনিয়োগ ইয়েস ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক সংযোগ ও কৌশলগত শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই জাপানি ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিদের বোর্ডে নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রেগুলেটরি দিক থেকে কী বলা হয়েছে?

ইয়েস ব্যাঙ্ক তাদের ফাইলিংয়ে জানিয়েছে, বিনয় টোন্সে সেবি বা অন্য কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে ডিরেক্টর পদে থাকার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ নন। এই ঘোষণা বিএসই এবং এনএসই-র নির্দেশিকা অনুযায়ী করা হয়েছে।

এছাড়াও ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা নেতৃত্ব পরিবর্তন সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য জানতে পারেন।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তবে নতুন সিইওর সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। ইয়েস ব্যাঙ্ককে এখন একদিকে প্রতিযোগিতামূলক প্রাইভেট ব্যাঙ্কিং সেক্টরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে, অন্যদিকে গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়াতে হবে। ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং, রিটেল লোন, এবং পরিষেবার গুণগত মান উন্নয়ন- এই তিনটি ক্ষেত্র আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েস ব্যাঙ্ক এখন পুনরুদ্ধারের পর্যায় থেকে বৃদ্ধির পর্যায়ে ঢুকতে চাইছে। আর সেই সময়েই অভিজ্ঞ রিটেল ব্যাঙ্কার হিসেবে বিনয় টোন্সের আগমন ব্যাঙ্কের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইয়েস ব্যাঙ্কে এই নেতৃত্ব পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশের ইঙ্গিত। সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পর এখন লক্ষ্য স্থায়ী বৃদ্ধি এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন। নতুন নেতৃত্ব সেই লক্ষ্য কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটাই এখন দেখার। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।