লাল কেল্লার কাছে সোমবার সন্ধ্যায় এক আই২০ গাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।

সূচনা পল্ল্যে, সাংবাদিক : রাজধানী দিল্লির বুকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। লাল কেল্লার কাছে সোমবার সন্ধ্যায় এক আই২০ গাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল শহর। ঘটনাস্থল থেকে এখনও মিলছে পোড়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ধোঁয়ার গন্ধ আর মানুষের মধ্যে আতঙ্কের ছাপ। তদন্তে নেমেছে দিল্লি পুলিশ, এনআইএ, এনএসজি। প্রাথমিকভাবে উঠে আসছে সন্ত্রাসের যোগ।
সোমবার সন্ধ্যে ঠিক ৬টা ৫২ মিনিট। লাল কেল্লা মেট্রো স্টেশনের কাছে আচমকাই এক ভয়ানক শব্দে কেঁপে ওঠে রাজধানী। মুহূর্তে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় হুন্ডাই আই২০ গাড়িটি। বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের কয়েকটি গাড়ি ও দোকানেও আগুন ধরে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শব্দটা এতটাই প্রবল ছিল যে আশপাশের ভবনের কাঁচ ভেঙে পড়ে, বিদ্যুতের খুঁটি উড়ে যায়, আর অন্ধকারে ডুবে যায় গোটা এলাকা। পুলিশ ও দমকল সূত্রে খবর- প্রথম ফোন আসে বিস্ফোরণের তিন মিনিট পর। রাত ১১টার মধ্যে নিশ্চিত হয়- মৃত ৯, আহত অন্তত ২০ জন।
বিস্ফোরণের পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় ফরেন্সিক দল। দিল্লি পুলিশ বিস্ফোরণের ধরণ দেখে নিশ্চিত হয়- গাড়িটিতে বিস্ফোরক বোমা দিয়ে ভর্তি ছিল। ফরেন্সিক রিপোর্ট ও গোয়েন্দা তথ্য মিলিয়ে পুলিশ এখন ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act)- এর ধারা প্রয়োগ করেছে। অর্থাৎ, এটি সন্ত্রাসবাদী হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা জোরদার। তদন্তের মোড় ঘোরায় একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়-

বিস্ফোরণের আগে ওই আই২০ গাড়িটি দারিয়াগঞ্জের বাজার এলাকা থেকে রওনা হয়
বিকেল ৪টে নাগাদ সেটি পৌঁছয় সোনেহরি মসজিদের কাছে পার্কিং লটে
এরপর সন্ধ্যায় দেখা যায়- গাড়িটি চট্টা রেল চকের কাছে ইউ-টার্ন নেয়
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে লোয়ার সুভাষ মার্গের দিকে
ঠিক সিগন্যালের কাছে গাড়িটি গতি কমায়
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, “ফুটেজ থেকে গাড়ির পথ, সময়, আর কোথায় কোথায় তা থেমেছিল, সব জানা যাচ্ছে। এটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করছে , বিস্ফোরণটা রিমোটে না ম্যানুয়ালি ঘটানো হয়েছিল।” এখন তদন্তকারীরা দারিয়াগঞ্জ থেকে রেড ফোর্ট পর্যন্ত গাড়িটির প্রায় ছ’ঘণ্টার পুরো গতিপথ ম্যাপ করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই গাড়িটির মালিকানা জটিলভাবে বদলানো হয়েছিল- যেন প্রকৃত মালিক বা চালকের নাম গোপন থাকে। তদন্তে উঠে এসেছে মোহাম্মদ সালমান, নাদিম, রয়্যাল কার জোন (ফরিদাবাদ), তারিক ও ডাঃ উমর মোহাম্মদের নাম। এই পুরো চেনটি ইচ্ছে করেই তৈরি করা হয়েছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। বিস্ফোরণের পর ডাঃ মুজ্জামিল শাকিলের গ্রেফতারি অনেক সূত্র খুলে দেয়। তাঁর কাছ থেকে ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করেছিল পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, নেটওয়ার্ক ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ডাঃ উমর নিজেই রেড ফোর্ট বিস্ফোরণটি ঘটান।
এদিকে, বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগেই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ ফরিদাবাদের দুটি বাড়ি থেকে প্রায় ৩,০০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করে। এর মধ্যে ছিল ৩৫০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট- যা দিয়ে সহজেই ভয়ঙ্কর বোমা তৈরি করা যায়। তদন্তে জানা গেছে, ওই সামগ্রী সরবরাহ করেছিল জে-কে ভিত্তিক নেটওয়ার্ক, যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডাঃ আদিল রাথার। ফলে, ফরিদাবাদ টেরর মডিউল আর দিল্লি বিস্ফোরণের মধ্যে এখন যোগসূত্র খুঁজছে এনআইএ।
এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১২ ছুঁয়েছে, আহত ২৯। এদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের চিকিৎসা চলছে LNJP Hospital ও AIIMS Trauma Centre-এ।

হেল্পলাইন নম্বর:
📞 LNJP – 011-23233400 / Emergency – 011-23239249
📞 AIIMS Trauma – 011-26594405
📞 Delhi Police – 112 / Control Room – 011-22910010, 011-22910011
মৃতদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছেন-
অশোক কুমার, পিতা জগবংশ সিং, হাসনপুর, আমরোহা, উত্তরপ্রদেশ
আরও কয়েকজনের দেহ উদ্ধার হয়েছে, যাদের পরিচয় এখনো অজ্ঞাত
আহতদের মধ্যে রয়েছেন-
শায়না পারভিন (দিল্লি)
হর্ষুল (উত্তরাখণ্ড)
শিবা জায়সওয়াল (উত্তরপ্রদেশ)
সমীর (দিল্লি)
জোগিন্দর (দিল্লি)
ভবানি শঙ্কর শর্মা (দিল্লি)
গীতা (দিল্লি)
বিনয় পাঠক (দিল্লি)
পান্যু (উত্তরপ্রদেশ)
বিনোদ (দিল্লি)
শিবম ঝা (দিল্লি)
মোহাম্মদ শাহনওয়াজ (দিল্লি)
অঙ্কুশ শর্মা (দিল্লি)
মোহাম্মদ ফারুখ (দিল্লি)
তিলক রাজ (হিমাচল প্রদেশ)
মোহাম্মদ সাফওয়ান (দিল্লি)
মোহাম্মদ দাউদ (গাজিয়াবাদ)
কিশোরী লাল (দিল্লি)
আজাদ (দিল্লি)
দিল্লি পুলিশ স্পেশাল সেল ও এনআইএ যৌথভাবে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাতভর পাহাড়গঞ্জ, দারিয়াগঞ্জ ও রেড ফোর্ট চত্বরের হোটেল ও গেস্ট হাউসে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। চারজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, গাড়িটি বদরপুর বর্ডার হয়ে দিল্লিতে প্রবেশ করেছিল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, “এটা শুধু দিল্লির ওপর নয়, গোটা দেশের ওপর আঘাত। অপরাধীরা যে-ই হোক, কাউকে ছাড়া হবে না।”
একদিকে ফরিদাবাদ থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক, অন্যদিকে লাল কেল্লার সামনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ- সব মিলিয়ে ফের সন্ত্রাসের ছায়া ঘনাচ্ছে রাজধানীতে। তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থানের সামনে এভাবে কীভাবে ঘটল এই বিস্ফোরণ?