সিপিএম ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন দুই ফ্রন্টের পাশাপাশি উঠে এসেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ।

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : বাংলার পাশাপাশি ভোটের গণগণে আঁচে উত্তপ্ত দক্ষিণ ভারতের অন্যতম রাজ্য কেরল। ৯ এপ্রিল মাত্র এক দফাতেই কেরলে ভোট, ফল ঘোষণা ৪ মে। বহু দশক ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে আসছে দুই ফ্রন্টের মধ্যে। এবারের লড়াই ত্রিমুখী। সিপিএম ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন দুই ফ্রন্টের পাশাপাশি উঠে এসেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ।
দীর্ঘ ১০ বছর সিপিএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ ক্ষমতায় থাকায় স্বভাবতই প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া কাজ করছে। কেরলের নির্বাচনী কাঠামো বেশ সরল – ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউডিএফ এবং লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা এলডিএফ পালাক্রমে রাজ্য শাসন করে আসছে। কিন্তু ২০২১ সালে এই ছন্দ ভেঙে যায়, যখন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন টানা দ্বিতীয়বারের মতো শপথ গ্রহণ করেন এবং এরপর থেকে এক অভূতপূর্ব দশ বছরের মেয়াদে রাজ্য শাসন করে চলেছেন। কিন্তু গত পাঁচ বছর এলডিএফ-এর জন্য খুব একটা মসৃণ ছিল না; চ্যালেঞ্জগুলো বেড়েই চলেছে– ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে মানুষ বিকল্প খোঁজার কথা ভাবছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সরকার-বিরোধী মনোভাব বিদ্যমান। স্বাধীন সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে প্রায় অর্ধেক ভোটার পরিবর্তন চান।
কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক ত্রুটি এবং রাজ্যের আর্থিক সংকট সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জনকল্যাণমূলক অর্থ প্রদানে বিলম্ব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা এর ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ণ করেছে। কিন্তু এলডিএফ-এর পক্ষে যা কাজ করে তা হলো, কেরালার ভোটাররা বিচক্ষণ; বিরোধী দল একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প উপস্থাপন না করলে অসন্তোষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাসন পরিবর্তনে পরিণত হয় না। ইউডিএফ-এর জন্য এই নির্বাচন একাধারে একটি সুযোগ এবং একটি চ্যালেঞ্জ।
তারপর বিজেপির কাছে বড় পাওনা তিরুবনন্তপুরম কর্পোরেশন বামফ্রন্টের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া। তিরুবনন্তপুরমে ৪৫ বছর ধরে আধিপত্য ছিল বামেদের। সেই দুর্গ ভেঙে দিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে গেরুয়া শিবির।
অন্যদিকে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে-রা ১০ বছর পরে কেরলে আবার ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে বামেদের সঙ্গে বিজেপির আঁতাঁতের অভিযোগ তুলছেন। পাল্টা শাসক দল সিপিএমের তরফে পিনারাই বিজয়নের পাল্টা কংগ্রেসকে বিজেপির বি-টিম বলছেন। এই চাপানউতোরের মধ্যে শনিবার কেরলে প্রচার এবং রোড শো করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, কংগ্রেস-সিপিএম মিথ্যা কথার ফ্যাক্টরি। এখানে বিজেপিই শুধুমাত্র এ-টিম। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগকে তুলে ধরে বিরোধীদের নিশানা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি অনুদান আইন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কিংবা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন-সব বিষয়েই ওর বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে রণবীর সিংয়ের ধুরন্ধর সিনেমার নাম, যে ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর কথায় বিরোধীরা বলে দ্য কেরালা স্টোরি মিথ্যা, দ্য কাশ্মীর ফাইলস মিথ্যা, আর এখন বলছে ধুরন্ধরও মিথ্যা।
এদিকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পাল্টা দিয়ে দাবি করেন, কেরলের মানুষ খুবই চালাক এবং শিক্ষিত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, মুখ্যমন্ত্রী পি বিজয়ন আপানারা দুজনেই গুজরাত বা অন্য কোনো জায়গার মানুষকে বোকা বানাতে পারেন, কিন্তু কেরলের মানুষকে বোকা বানাতে পারবেন না, বলেন মল্লিকার্জুন খাড়গে।
এলডিএফ ও বিজেপি একযোগে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কংগ্রেসকে আক্রমণ করছে। কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পি বিজয়ন নরেন্দ্র মোদীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন বলেও বিস্ফোরক দাবি করেন মল্লিকার্জুন খাড়গে।
দোষারোপ পাল্টা দোষারোপের মধ্যেই কেরলে নজর কেড়েছে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তেহার। এনডিএ-র ইস্তেহারে গরিব মহিলাদের মাসে ২৫০০ টাকা ভোক্ষ্য আরোগ্য সুরক্ষা কার্ড দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। ওই টাকা দিয়ে মহিলারা কার্ড রিচার্জকরে খাদ্য ও চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। এছাড়াও প্রতি মাসে বাড়ি পিছু ২০ হাজার লিটার জল পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে এনডিএ ইস্তেহারে। পাশাপাশি শবরীমালা মন্দিরের সোনা চুরি বিতর্কের সিবিআই তদন্ত হবে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এবং দেবস্বম বোর্ড ঢেলে সাজানোর কথাও রয়েছে এনডিএ-র ইস্তেহারে।
বামেরা অবশ্য নজর দিয়েছে দারিদ্র দূরীকরণের ঘোষিত পরিকল্পনা অব্যাহত রাখা এবং সাধারণ জনতার আয় বাড়ানোয়। সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পে পেনশন তিন হাজার টাকা করার পাশাপাশি মহিলাদের জন্য পাঁচ বছরে কুড়ি লক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে বাম ইস্তেহারে।
বাম ও বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফ তাদের বাজি ইন্দিরা গ্যারান্টি। তার মধ্যে রয়েছে উন্মেন চান্ডি স্বাস্থ্য বিমা চালু করে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার খরচে ব্যবস্থা, সরকারি পরিবহণ সংস্থা কেসিআরটিসি-র বাসে বিনামূল্যে মহিলাদের ভ্রমণ, কলেজ ছাত্রীদের জন্য মাসে ১ হাজার টাকা সহায়তা, যুবদের ব্যবসা শুরুর জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণের বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি।
কেরলে এসআইআর-এ ২৪ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তিরুবনন্তপুরম, ইডুক্কি, কোট্টায়ম, এর্নাকুলাম এবং ত্রিশূর সহ দক্ষিণ-মধ্য কেরলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলিতে ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।কেরলের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে নতুন গোলার্ধ তৈরি হয়েছে,তার কেন্দ্রবিন্দু এখন স্পষ্ট-নগরাঞ্চলে বিজেপির উত্থান আর এলডিএফের দুর্বলতা পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে। এখন দেখার ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে এই নগরভিত্তিক অগ্রগতি কতটা প্রভাবে ফেলে।