ডায়মন্ড হারবারে জনস্রোত, অভিষেকের রোড শোতেই বিজেপিকে ‘হারার সার্টিফিকেট’!”

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমশই বাড়ছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেই উত্তাপকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী পান্নালাল হালদারের সমর্থনে বিশাল রোড শো করে কার্যত শক্তিপ্রদর্শন করল তৃণমূল শিবির।
এদিন কপাট এলাকা থেকে শুরু হয়ে ডায়মন্ড হারবার এম বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই রোড শো ঘিরে সাধারণ মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের দু’ধারে ভিড় জমায় হাজার হাজার মানুষ। দলীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুনে গোটা এলাকা তৃণমূলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, স্লোগান আর ঢাকের তালে তালে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
রোড শোতে উপস্থিত ছিলেন মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তথা ডায়মন্ড হারবারের পর্যবেক্ষক শামীম আহমেদ। এছাড়াও ছিলেন ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী পান্নালাল হালদার। তাঁদের উপস্থিতিতে এই রোড শো কার্যত শক্তি প্রদর্শনের রূপ নেয়।
রোড শো শেষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপি প্রার্থী দীপক কুমার হালদারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “পান্নালাল হালদার আর দীপক হালদারের মধ্যে একটা মিল আছে—পান্নালালবাবু দ্বিতীয়বার জিতবেন আর দীপক হালদার দ্বিতীয়বার হারবেন।” এই মন্তব্যে উপস্থিত জনতার মধ্যে হাসির রোল ওঠে এবং করতালিতে ফেটে পড়ে সভাস্থল।
তিনি আরও বলেন, “যে ছাত্র টানা দু’বার ফেল করে, তাকে স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। ঠিক সেইভাবেই দীপক হালদারও এখানে হেরে যাওয়ার পর ডায়মন্ড হারবারে থাকতে পারবেন না। মানুষ তাঁকে ফিরিয়ে দেবে।” তাঁর এই বক্তব্যে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলে অভিষেক বলেন, “১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র সরকার। বাংলার প্রাপ্য টাকা দিচ্ছে না। তবুও আমরা মানুষের পাশে থেকেছি, উন্নয়নের কাজ থামাইনি।” তিনি দাবি করেন, তৃণমূল সরকারের আমলে ডায়মন্ড হারবারে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে—রাস্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে।
করোনা মহামারীর সময় তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “করোনার সময় আমরা টানা ২১ দিন কল্পতরুর মতো মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়েছি। তখন কেউ পাশে ছিল না, তৃণমূলই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল।” এই প্রসঙ্গ টেনে তিনি মানুষের সঙ্গে দলের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করেন।
বিজেপির বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, “ডায়মন্ড হারবারে বিজেপির পতাকা ধরার লোক নেই। যেটুকু আছে, আগামী দিনে মানুষই তা সরিয়ে দেবে।” একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “অস্ত্র ঝনঝনানি এখানে চলবে না। ডায়মন্ড হারবারের মানুষ শান্তিপ্রিয়। যদি কেউ ভয় দেখানোর চেষ্টা করে, তার জবাব ভোট বাক্সে দেবে মানুষ।”
সিপিএম আমলের কথাও তুলে ধরেন অভিষেক। তিনি বলেন, “এক সময় ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূল একটি পতাকাও লাগাতে পারত না। আমরা এখন সৌজন্যতা দেখাচ্ছি, কিন্তু সেটাকে দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবে বিরোধীরা।” তাঁর এই মন্তব্যে অতীত ও বর্তমান রাজনীতির তুলনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক আবেগেও আঘাত করেন তিনি। বলেন, “বাংলা ও বাঙালিকে অপমান করা হলে আমরা ছেড়ে কথা বলব না। প্রয়োজনে রবীন্দ্রসংগীতের সুরেই জবাব দেওয়া হবে।” তাঁর এই বক্তব্যে বাঙালিয়ানার আবেগকে সামনে আনার চেষ্টা স্পষ্ট।

প্রথম দফার নির্বাচনে তৃণমূলের সাফল্যের দাবিও করেন অভিষেক। তিনি বলেন, “প্রথম দফায় আমরা সেঞ্চুরি পেরিয়ে গেছি। কোথায় গিয়ে থামব, তা এখনই বলা কঠিন।” এই মন্তব্যে দলের আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “কলকাতা আমার জন্মভূমি হলেও কর্মভূমি ডায়মন্ড হারবার। এখানে এলেই মনে হয় পরিবারের মধ্যে ফিরে এসেছি। এই এলাকার মানুষ আমার নিজের মানুষের মতো।” তাঁর এই আবেগঘন মন্তব্য উপস্থিত জনতার সঙ্গে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
সব মিলিয়ে, এই রোড শো শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল শক্তি প্রদর্শন, আবেগের প্রকাশ এবং নির্বাচনী বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক বড় মঞ্চ। ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূলের এই বিশাল সমাবেশ ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্রমণাত্মক ভাষণ স্পষ্ট করে দিয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে এই কেন্দ্র ঘিরে লড়াই যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
এখন দেখার, ভোটের ময়দানে এই শক্তি প্রদর্শন কতটা প্রভাব ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত ডায়মন্ড হারবারের মানুষ কাকে বেছে নেন। তবে আপাতত রোড শোর ভিড় ও উচ্ছ্বাস দেখে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই লড়াইয়ে তৃণমূল অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।