আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য দাবি করেন, অভিষেকের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একদিকে চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রার আইনি জট কাটিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি। অন্যদিকে তার ঠিক পরেই ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়া নিয়ে নতুন করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত কয়েক দিনে একের পর এক আইনি টানাপোড়েনের মধ্যেই ফের আদালতের দরজায় অভিষেক। সোমবার বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য দাবি করেন, অভিষেকের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে, সেই কারণ ব্যাঙ্কের তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। বিষয়টি জরুরি, কারণ সামনেই চোখের চিকিৎসার জন্য অভিষেকের বিদেশ সফর রয়েছে। ফলে বিদেশ যাওয়ার আগে নিজের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে না পারার বিষয়টি নিয়ে দ্রুত আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেই দাবি করেন তাঁর আইনজীবী।
অভিষেকের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বা BNSS-এর ১০৭ নম্বর ধারার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই ধারার অধীনে তদন্তের প্রয়োজনে কোনও সম্পত্তি বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করার নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু অভিষেকের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেই আদালতে দাবি করা হয়েছে। তাই কীভাবে এবং কোন আইনি ভিত্তিতে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হল। সেই প্রশ্নই আদালতের সামনে তুলে ধরেন অয়ন ভট্টাচার্য। পাশাপাশি মামলাটির দ্রুত শুনানির আবেদনও জানান তিনি।
এর পর বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানতে চান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনও তদন্ত বা মামলা চলছে কি না। জবাবে তাঁর আইনজীবী জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অভিষেক সংশ্লিষ্ট তদন্তে সহযোগিতা করছেন। তবে সেই তদন্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার কোনও সম্পর্ক নেই বলেই আদালতে দাবি করেন তিনি। আইনজীবীর বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পক্ষকে নোটিস দেওয়ার নির্দেশ দেন। আগামী বুধবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা। ফলে এখন নজর থাকবে, আদালতে ব্যাঙ্কের তরফে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার কারণ হিসেবে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি কীভাবে ব্যাখ্যা করে।
অভিষেককে ঘিরে সাম্প্রতিক আইনি ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেও বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরেই চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আইনি লড়াই চালাচ্ছিলেন তৃণমূলের এই সাংসদ। জুলাই মাসে কলকাতা হাই কোর্ট তাঁর বিদেশযাত্রার বিষয়ে জরুরি স্বস্তি দেয়নি এবং পরে বিষয়টি আদালতের নিয়মিত শুনানির তালিকায় যায়। এরপর সুপ্রিম কোর্টও কলকাতা হাই কোর্টকে বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করার কথা জানিয়েছিল।
পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্ট অভিষেকের বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসার আবেদন খারিজ করে। আদালতের তরফে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে হাজির হওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু অভিষেকের পক্ষ থেকে সেই মেডিক্যাল পরীক্ষায় যেতে অস্বীকার করে বিদেশে আগে যে বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিয়েছিলেন, তাঁর কাছেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানানো হয়। এর পরই হাই কোর্ট তাঁর বিদেশযাত্রার আবেদন খারিজ করে।
হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্তের পর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিষেক। শেষ পর্যন্ত শীর্ষ আদালত তাঁকে তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করানোর অনুমতি দেয়। তবে বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্তও রাখা হয়েছে। ফলে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার পথ খুললেও আইনি নজরদারি পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এবার সামনে এল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের বিষয়টি। অর্থাৎ বিদেশযাত্রা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে আপাতত স্বস্তি পাওয়ার পরই ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে নতুন করে আদালতের দ্বারস্থ হতে হল অভিষেককে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার দাবি করেছেন, ব্যাঙ্কের তরফে কীভাবে এবং কেন অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে, সেই ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে। তাঁর বক্তব্য, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক নিজস্ব প্রক্রিয়াতেও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় ঠিক কী কারণে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। তার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এখন আদালতের সামনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্যের উপরই নির্ভর করছে।
সব মিলিয়ে, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়ার পরই ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ নিয়ে নতুন করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন আগামী বুধবারের শুনানিতে আদালতে কী উঠে আসে, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি কী ব্যাখ্যা দেয় এবং এই মামলায় কলকাতা হাই কোর্ট কী নির্দেশ দেয়। সেদিকেই নজর থাকবে।
এই ঘটনা নিয়ে আপনাদের কী মত? আপনাদের কি মনে হয়, আইনি প্রক্রিয়া মেনেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। নাকি বিষয়টি নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আসা প্রয়োজন?