“সম্প্রীতি বিঘ্নিত হতে পারে, এমন মন্তব্য করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা ছড়িয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। “

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশিরভাগ নেতাই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছেন। এর পাশাপাশি ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে অভিষেকের আমদানি করা কর্পোরেট সংস্থা আই-প্যাক নিয়েও অভিযোগের আঙুল সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই।
বিধানসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ২০৮টি আসনে তারা জিতেছে। তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। ভোটে এই ভরাডুবির পর থেকে তৃণমূলে অশান্তি, বিদ্রোহ অব্যাহত। নেতারা একের পর এক দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, তোলাবাজির কারণেই যে মানুষ এই রায় দিয়েছে, তা মেনে নিয়ে দলের সমালোচনা করা হচ্ছে প্রকাশ্যেই।
আরও অস্বস্তি বাড়ল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের । ভবানীপুর থানায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নতুন একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর আগেও বিধাননগর সাইবার থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। এবার ভবানীপুর থানায় ডায়মন্ডহারবারের সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগকারী অর্ণবকান্তি দাসের দাবি, সম্প্রীতি বিঘ্নিত হতে পারে, এমন মন্তব্য করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা ছড়িয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ব্যাপারে সোশাল মিডিয়ার একটি কপিও পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। তারই ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্তও পুলিশ শুরু করেছে বলে খবর।
ঘটনার সূত্রপাত, গত ২ মে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সোশাল মিডিয়া একটি পোস্ট করেন। আর সেই পোস্ট ঘিরেই বিতর্ক। অভিযোগকারীর দাবি, ওই পোস্টে এমন কিছু লেখা হয়েছে, তাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং জাতীয় সংহতি লঙ্ঘিত হতে পারে। শুধু তাই নয়, একজন সাংসদ হিসাবে কীভাবে এমন পোস্ট করতে পারেন তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী অর্ণবকান্তি দাস। অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ বলেও মন্তব্য তাঁর।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ভবানীপুর থানায় অভিযোগ দায়ের হল। বুধবার রাতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের নামে অভিযোগ দায়ের হয়। গুজরাতি সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগ অভিষেকের বিরুদ্ধে। এক্স হ্যান্ডলে গুজরাতি সম্প্রদায়ের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন অর্ণবকান্তি দাস নামের এক ব্যক্তি। লিখিতে অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২ মে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেন অভিষেক, যাতে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি গ্যাং শব্দটি ব্যবহার করেন। অর্ণবকান্তির অভিযোগ, গুজরাতি সম্প্রদায়ের মানুষের ভাবাবেগে আঘাত করেছেন অভিষেক। যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন তিনি, তাতে সামাজিক অশান্তি হতে পারে, অভিষেকের মন্তব্য উস্কানিমূলক বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
অর্ণবকান্তি নিজেও ভবানীপুরের বাসিন্দা। বুধবার বিকেলে দু’পাতার অভিযোগ জমা দেন তিনি। সেই অভিযোগপত্র গৃহীত হয়েছে থানায়। অভিযোগপত্রটির রিসিভিং সাইনও দেওয়া হয়েছে অভিযোগকারীকে। এর আগে অভিষেকের বিরুদ্ধে বিধাননগর কমিশনারেটে অভিযোগ দায়ের হয়। সেই নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিষেক। এবার দ্বিতীয় অভিযোগ দায়ের হল, তাও আবার কলকাতার ভবানীপুর থানায়।
অভিষেকের যে পোস্ট ঘিরে এই অভিযোগ, সেটি গত ২ মে-র। ফলতায় পুনর্নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের সেই ঘোষণা নিয়ে কটাক্ষ করেন বিজেপি-র আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য। তিনি লেখেন, ডায়মন্ড হারবার মডেল চুরমার। মালব্যর ওই পোস্টটি শেয়ার করে অভিষেক পাল্টা লেখেন, বাংলা বিরোধী গুজরাতি গ্যাং এবং তাদের হাতের পুতুল জ্ঞানেশ কুমার দশ জন্মেও ডায়মন্ড হারবার মডেলের গায়ে টোল ফেলতে পারবে না। যা আছে নিয়ে এসো। আমি ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছি, ফলতায় আসুন। মহা শক্তিমান গডফাদারদের পাঠান দিল্লি থেকে। সাহস থাকলে ফলতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন।
বলে রাখা প্রয়োজন, ভোট প্রচারে উসকানিমূলক মন্তব্যের জেরে অভিষেকের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম থানায় মোট ৫ টি ধারায় মামলা দায়ের হয়। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের প্রচার চলাকালীন প্রায় প্রতি সভা থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে লাগাতার কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ২৭ এপ্রিল এক জনসভায় বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে অভিষেকের বক্তব্য ছিল, আমি দেখব, ৪ তারিখ রাত ১২টার পরে কে তাদের বাঁচাতে আসে। এই জল্লাদদের কত ক্ষমতা আছে, আর দিল্লি থেকে কোন বাবা তাদের উদ্ধার করতে আসে, সেটাও দেখব। এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেই গত কয়েকদিন আগে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের দ্বারস্থ হন বাগুইআটির বাসিন্দা রাজীব সরকার। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআইআর দায়ের করা হয়।
যদিও এহেন এফআইআরকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিষেক। সেই মামলায় ইতিমধ্যে রক্ষাকবচও পেয়েছেন। কিন্তু এরমধ্যেই অস্বস্তি বাড়িয়ে ফের নতুন অভিযোগ তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে।