রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বলছে, ত্রিপুরার এবারের এডিসি ভোটে ত্রিমুখী লড়াই হতে চলেছে। একদিকে রাজ্যের শাসক দল বিজেপি। অন্যদিকে বিজেপিরই সহযোগী দল তিপ্রামথা ও প্রধান বিরোধী দল সিপিএম।

সূচনা পল্য়ে, সাংবাদিক : ত্রিপুরা উপজাতীয় অঞ্চল স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ ভোট বা এডিসি ভোট। রাজ্য রাজনীতিতে বরাবরই এর বিশেষ গুরুত্ব দেখা গিয়েছে। রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বলছে, ত্রিপুরার এবারের এডিসি ভোটে ত্রিমুখী লড়াই হতে চলেছে। একদিকে রাজ্যের শাসক দল বিজেপি। অন্যদিকে বিজেপিরই সহযোগী দল তিপ্রামথা ও প্রধান বিরোধী দল সিপিএম। শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা বলছেন, কেবলমাত্র ভারতীয় জনতা পার্টিই আদিবাসী ও জনজাতিদের উন্নয়ন করতে পারে। Tripura Tribal Areas Autonomous District Council ভোট। সংক্ষেপে এডিসি নির্বাচন। রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার ভোট। ভোট ছোট হোক বা বড়, রাজনৈতিক উত্তাপ থাকবেই। তাই ত্রিপুরার পাহাড় অধ্যুষিত জনজাতি এলাকাগুলিতে প্রতিনিয়ত পরিদর্শনে গিয়ে শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বিজেপিরই সহযোগী দল তিপ্রামথার প্রধান প্রদ্যোৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মা। তাঁর কথায়, যতই ডবল ইঞ্জিন হোক না কেন, পানীয় জলের সমস্যায় ভুগছেন জনজাতিরা। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহাকেও ছেড়ে কথা বললেন না। তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রী যদি এখানে আসতেন তা হলে বুঝতেন, জনজাতি মানুষ কতটা কষ্টে আছেন।

রাজনৈতিক এই উত্তাপের মধ্যেই এডিসি নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হতেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। আগামী ১২ এপ্রিল ত্রিপুরা ট্রাইবেল এরিয়া অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের আগে খোয়াই জেলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখতে আয়োজিত হয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। খোয়াই জেলা শাসকের উদ্যোগে কনফারেন্স হলে আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা শাসক রজত পন্থ, রিটার্নিং অফিসাররা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। বৈঠকে মূলত আলোচনা হয় নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোট পরিচালনার সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জেলা শাসক স্পষ্ট বার্তা দেন- নির্বাচন কমিশনের নিয়ম ভাঙলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বার্তা কার্যত রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের উদ্দেশ্যেই। খোয়াই জেলায় মোট তিনটি আসনে ভোটগ্রহণ হবে- ৯ হালাহালী আশারামবাড়ী, ১২ রামচন্দ্রঘাট এবং ১১ মহারানী তেলিয়ামুড়া। প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি আসনেই ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ৯ নম্বর আসনে মোট ভোটার ৩৪ হাজার ৬৩২ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৫২৪ এবং মহিলা ভোটার ১৭ হাজার ১০৪। ১২ নম্বর আসনে মোট ভোটার ৩০ হাজার ৫১১ জন- পুরুষ ১৫ হাজার ২৪২ এবং মহিলা ১৫ হাজার ২৬৯। অন্যদিকে ১১ নম্বর আসনে মোট ভোটার ৩১ হাজার ৭৬৭ জন- পুরুষ ১৫ হাজার ৮০০ এবং মহিলা ১৫ হাজার ৯৬৭। ভোটের আগে প্রশাসন স্পষ্টভাবে সময়সূচিও জানিয়ে দিয়েছে। আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে মনোনয়ন জমা দিতে হবে। ২৬ মার্চ স্ক্রুটিনি হবে, আর ২৮ মার্চ মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোটগ্রহণ ১২ এপ্রিল এবং গণনা ১৭ এপ্রিল। ১৮ এপ্রিলের মধ্যে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এই বৈঠকের মাধ্যমে প্রশাসন পরিষ্কার করে দিয়েছে- নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনও রকম ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। ফলে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়লেও প্রশাসন যে কড়া অবস্থানে রয়েছে, তা স্পষ্ট।

এডিসি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘর্ষ। সিপাহীজলা জেলার ১৯ আমতলী-গোলাঘাটি কেন্দ্র থেকে সিপিআইএম প্রার্থী বৃন্দা রানী দেববর্মা নিজের মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। বিশালগড় মহকুমা শাসক তথা রিটার্নিং অফিসার বিঙ্কি সাহার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। এই সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলের জেলা সম্পাদক, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কর্মী-সমর্থকেরা। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরই তিনি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেন। তিনি বলেন, এডিসি এলাকা জনজাতি মানুষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের অধিকার এবং সুরক্ষার প্রতীক। তাই কোনওভাবেই এই এলাকা বিজেপি বা তিপ্রামথার হাতে যেতে দেওয়া যাবে না। প্রসঙ্গত, প্রথমে নির্বাচন কমিশন ১৩ এপ্রিল ভোটের দিন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ওই দিন গরিয়া পুজো, বিজু ও বুইসু উৎসব থাকায় বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি ওঠে। পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলে ১২ এপ্রিল ভোটের দিন নির্ধারণ করা হয়। এই পরিবর্তন জনজাতি ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বৃন্দা রানী দেববর্মা জানিয়েছেন, তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের সমর্থন তাঁর পাশে রয়েছে। সেই ভরসাতেই তিনি ভোটের ময়দানে নেমেছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এডিসি নির্বাচন এবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কারণ এই নির্বাচনের ফলাফল আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মনোনয়ন পর্ব শুরু হতেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। এখন দেখার, শেষ পর্যন্ত জনতার রায় কোন দিকে যায় এবং কোন দল এডিসি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এডিসি নির্বাচন সামনে, আর তার আগেই ত্রিপুরায় জনজীবনে প্রভাব ফেলছে পানীয় জলের সংকট। দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম এলাকায় এই সমস্যা এখন বিস্ফোরণের আকার নিয়েছে। বেতাগা এডিসি ভিলেজের হরিচন্দ্র পাড়ার জনজাতি মানুষজন দীর্ঘদিন ধরে পানীয় জলের সমস্যায় ভুগছেন। তাঁদের অভিযোগ, বহুবার প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন। চালিতাছড়ি-মনুঘাট সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাস্তার উপর টায়ার জ্বালিয়ে, ব্যারিকেড বসিয়ে অবরোধ চালানো হয়। ফলে ওই এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, জল জীবন মিশন প্রকল্পের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনও সুবিধা তারা পাননি। কাগজে-কলমে প্রকল্প থাকলেও গ্রামে এখনও পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু ভোট মিটতেই আর তাঁদের দেখা যায় না। এই অবহেলার প্রতিবাদেই তারা রাস্তায় নেমেছেন। খবর পেয়ে প্রশাসনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন- সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় আন্দোলনে নামবেন। এই বিক্ষোভ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপও বাড়িয়ে দিল। কারণ জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় এই ধরনের অসন্তোষ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।