২৭ বছরের দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবনের অবসান।

রিয়া দাস, সাংবাদিক: নক্ষত্রের দেশে যাঁর যাতায়াত ছিল ঘরের পথের মতো সহজ। মহাকাশের নীরবতায় যাঁর হৃদস্পন্দন বহু বছর ধরে মিশে ছিল, আজ তাঁর যাত্রাপথে এল এক শান্ত বিরতি। সেই মহাকাশকন্যার এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। নাসার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস আনুষ্ঠানিক ভাবে অবসর গ্রহণ করলেন। ২৭ বছরের দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবন শেষে গত ২৭ ডিসেম্বর ৬০ বছর বয়সে নাসা থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এই খবর নিশ্চিত করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। মানববাহী মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে যাঁর নাম অনন্য উচ্চতায় লেখা থাকবে সেই সুনীতার অবসর শুধু একটি পেশাগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং মহাকাশ অনুসন্ধানের এক যুগের সমাপ্তি বলেই মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক নজরে সুনীতার যাত্রাপথ
সুনীতার মহাকাশযাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে
স্পেস শাটল ডিসকভারি-তে চড়ে প্রথমবার পৃথিবীর মায়া
কাটিয়ে মহাকাশে পাড়ি দেন সুনীতা উইলিয়ামস
নাসার এক্সপিডিশন ১৪/১৫ মিশনে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার
হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান সুনীতা
সেই অভিযানের সময় চারটি স্পেসওয়াক করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন
এরপর ২০১২ সালে দ্বিতীয় বার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে
যান এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস
১২৭ দিনের সেই অভিযানে শুধু অংশগ্রহণই নয় মহাকাশ
স্টেশনে কমান্ডারের গুরুদায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন তিনি
তাঁর তৃতীয় ও শেষ অভিযান ছিল ২০২৪ সালে
বোয়িং স্টারলাইনারে চড়ে আইএসএস-এ যাওয়া
সুনীতার সঙ্গী ছিলেন মার্কিন মহাকাশচারী বুচ উইলমোর
পরিকল্পনা ছিল মাত্র ১০ দিনের, কিন্তু যান্ত্রিক কারণে সেই
অভিযান রূপ নেয় দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্পে, প্রায় ১০ মাস মহাকাশে
আটকে থাকতে হয় তাঁদের, ২০২৫ সালে মার্চে
২৮৬ দিন পর পৃথিবীতে ফেরে দুজনেই

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মহাকাশচারীকে ঘিরে কৌতূহলের যেন শেষ নেই। শেষ অভিযানে একাধিক বার পৃথিবীতে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও নানা প্রযুক্তিগত ও পরিকল্পনাগত জটিলতায় সুনীতা উইলিয়ামস ও তাঁর সঙ্গীদের ফিরতে সময় লেগে যায় ২৮৬ দিন। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে ১৬ মার্চ ভোরে। ভারতীয় সময় ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ ফ্লোরিডার উপকূলবর্তী সমুদ্রে নিরাপদ অবতরণ করে স্পেসএক্সের মহাকাশযান ড্রাগন ফ্রিডম। দীর্ঘ সময় মহাকাশে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফেরার পর প্রথমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সুনীতা। সেখানেই উঠে আসে বহু প্রতীক্ষিত প্রশ্ন। মহাকাশ থেকে ভারতকে কেমন দেখাল? প্রশ্ন শুনেই আবেগ ও মুগ্ধতা লুকোতে না পেরে তিনি বলেন, ভারত অসাধারণ। তাঁর কথায়, হিমালয় পর্বতমালা থেকে শুরু করে গুজরাট ও মুম্বইয়ের মতো ব্যস্ত শহর সবকিছুই স্পষ্টভাবে নজরে এসেছে। সুনীতা জানান, যখনই হিমালয়ের উপর দিয়ে গিয়েছি চোখ ফেরানো যায়নি। উপর থেকে দেখে মনে হয়েছে, বিশাল পর্বতমালা যেন ঢেউয়ের মতো বয়ে নেমে এসেছে ভারতের দিকে। হিমালয়ের ঠিক নিচেই রঙের বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। পূর্ব দিক থেকে গুজরাট বা মুম্বইয়ের দিকে তাকালে সমুদ্রে মাছধরা নৌকাও দেখতে পেয়েছি, যদিও উপর থেকে ধীরে ধীরে ছোট শহরে রূপান্তরও স্পষ্ট বোঝা যায়। দিন হোক বা রাত ভারতকে সব সময়ই মহাকাশ থেকে অসাধারণ লাগে। তাঁর এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে হাজার মাইল দূরের মহাকাশ থেকে দেশের টান কতটা গভীর ও অনুভবযোগ্য।

দীর্ঘ কর্মজীবনে সুনীতা উইলিয়ামস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মোট তিনটি সফল অভিযান সম্পন্ন করেছেন। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান তাঁর অবদানকে স্মরণ করে বলেছেন, মানববাহী মহাকাশ অভিযানে সুনীতা উইলিয়ামস একজন অন্যতম পথিকৃৎ। মহাকাশ স্টেশনে সুদক্ষ নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বাণিজ্যিক অভিযানের পথও প্রশস্ত করেছেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে তাঁর অবদান দৃষ্টান্তমূলক। যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে ও অসম্ভবের গণ্ডি পেরোতে অনুপ্রাণিত করবে। নাসা তথা দেশের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
শিক্ষাজীবনেও সুনীতা ছিলেন সমান কৃতী। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর মেলবোর্নের ফ্লরিডা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট স্নাতকোত্তর করেন তিনি। এরপর যোগ দেন মার্কিন নৌসেনায়। হেলিকপ্টার ও ফিক্সড-উইং পাইলট হিসেবে ৪০টি ভিন্ন বিমানে ৪,০০০ ঘণ্টারও বেশি উড়ানের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ১৯৯৮ সালে নাসায় যোগ দেওয়ার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২৭ বছরের কর্মজীবনে তিনি মোট ৬০৮ দিন মহাকাশে কাটিয়েছেন যা নাসার ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময়। পাশাপাশি ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিটের ৯টি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করে যে কোনও মহিলা নভশ্চরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ডও গড়েছেন। মহাকাশে ম্যারাথন দৌড়োনো প্রথম মানুষ হিসেবেও ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন সুনীতা। অবসর ঘোষণা করলেও মহাকাশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা যে আজও অটুট, তা নিজের কথাতেই স্পষ্ট করেছেন সুনীতা উইলিয়ামস। তিনি বলেন, যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁরা জানেন মহাকাশ আমার কতটা প্রিয় জায়গা। মহাকাশচারী হতে পারা এবং তিন বার সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের এক অবিশ্বাস্য সম্মান। নাসায় ২৭ বছরের কর্মজীবনে সহকর্মীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছি তা আমি আজীবন মনে রাখব। নাসার আসন্ন আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযান নিয়ে প্রশ্ন করলেই চোখে-মুখে এখনও উচ্ছ্বাস ধরা পড়ে তাঁর। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, চাঁদে যেতে তো চাই কিন্তু আমার স্বামী আমাকে মেরে ফেলবেন। এবার ঘরে ফেরার সময়। এ বার না হয় মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে পরবর্তী প্রজন্মই তাদের জায়গা করে নিক।
একজন পথিকৃৎ যেমন করে নিঃশব্দে নিজের আলো ভবিষ্যতের হাতে তুলে দিয়ে সরে দাঁড়ান, ঠিক তেমন ভাবেই সুনীতা উইলিয়ামস আজ বিদায় নিলেন নক্ষত্রের দেশ থেকে। তাঁর বিদায় মানে শেষ নয় বরং তা এক নতুন প্রেরণার সূচনা। সাহস, অধ্যবসায় ও সীমাহীন স্বপ্ন দেখার শক্তি দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন আকাশই শেষ সীমানা নয়। পৃথিবীর আকাশে তাঁর রকেট আর না উঠলেও লক্ষ তরুণ-তরুণীর মনে আজও উড়ছে সুনীতা উইলিয়ামসের স্বপ্নের ডানা। যা আগামী দিনে মানুষকে আরও দূর, আরও গভীরে মহাকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।