ককরোচের পথে E20 জনতা পার্টি ?

পার্টির দাবি, ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো পেট্রোলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ককরোচ আন্দোলনের পর এবার ইথানল জ্বালানি নিয়ে ডিজিটাল বিদ্রোহ! দেশে কি আবারও তৈরি হচ্ছে এক নতুন ডিজিটাল গণআন্দোলন? প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ যে নজির গড়েছিল, তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে আরেকটি নাম— E20 জনতা পার্টি। দাবি একটাই— ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো পেট্রোলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তারা বলছে, সাধারণ মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে বিশুদ্ধ পেট্রোল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। এমনকি কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়করির পদত্যাগও দাবি করছে এই ডিজিটাল গোষ্ঠী। তাহলে কী এই E20? কেন এত বিতর্ক? সরকার কী বলছে? আর সোশ্যাল মিডিয়ার এই নতুন আন্দোলন আদৌ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?

কয়েক মাস আগেই NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে জন্ম নিয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা CJP। প্রথমে এটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক একটি ডিজিটাল প্রচার। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ তরুণ এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে এই আন্দোলন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর CJP তাদের দীর্ঘ আন্দোলন প্রত্যাহার করে। এই সাফল্যের পরই অনেকের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক প্রতিবাদের নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এবার সেই একই ধাঁচে তৈরি হয়েছে E20 জনতা পার্টি। ইনস্টাগ্রামেই কয়েক লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যে এই কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং অনুসারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এই গোষ্ঠীর বক্তব্য— মানুষকে ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ পেট্রোল কেনার সুযোগ দিতে হবে। E20 বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়। নীতিন গড়করি এই নীতির প্রধান মুখ হওয়ায় তাঁর পদত্যাগের দাবিও তুলেছে তারা। অর্থাৎ এটি এখন শুধুমাত্র জ্বালানির বিতর্ক নয়, বরং ভোক্তার পছন্দের স্বাধীনতা বনাম সরকারি নীতি— এই বিতর্কেও পরিণত হয়েছে।

E20 বলতে বোঝায় এমন পেট্রোল, যেখানে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ পেট্রোল থাকে। ইথানল সাধারণত আখ, ভুট্টা কিংবা অন্যান্য কৃষিজ ফসল থেকে উৎপাদিত একটি বায়োফুয়েল। ভারত বহু বছর ধরেই ধাপে ধাপে পেট্রোলে ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এর লক্ষ্য— অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানো, বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি এবং কার্বন নির্গমন কমানো। সরকারের মতে, এটি ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি।

তাহলে E20 পেট্রোলে আপত্তি কোথায়? সমালোচকদের অভিযোগ একাধিক। প্রথমত, ইথানলে শক্তির ঘনত্ব পেট্রোলের তুলনায় কম। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানিতে কিছুটা কম দূরত্ব অতিক্রম করা যায় বলে তাঁদের দাবি। দ্বিতীয়ত, পুরনো বা E10 উপযোগী গাড়িতে দীর্ঘদিন E20 ব্যবহার করলে ইঞ্জিন, রাবারের পাইপ, ফুয়েল সিস্টেম কিংবা অন্যান্য যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে— এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন অনেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু ব্যবহারকারী নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলছেন, মাইলেজ কমেছে। যদিও এই দাবিগুলির অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই নেই।

তবে E20 পেট্রোল নিয়ে সরকারের বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট। তাদের দাবি— E20 নিরাপদ। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পরীক্ষা এবং প্রস্তুতকারকদের মূল্যায়নে ইঞ্জিনের ক্ষতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সরকার অবশ্য এটাও স্বীকার করেছে— যে গাড়িগুলি শুধুমাত্র E10-এর জন্য তৈরি, সেখানে E20 ব্যবহার করলে সামান্য মাইলেজ কমতে পারে। তবে সেটি প্রযুক্তিগতভাবে প্রত্যাশিত বিষয় এবং ইঞ্জিনের বড় ক্ষতির প্রমাণ নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— সরকার জানিয়ে দিয়েছে, মিশ্রণবিহীন বা ১০০ শতাংশ পেট্রোলে ফিরে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ E20 নীতিতেই এগোতে চায় কেন্দ্র।

আজকের তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ রাজপথের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াকেও আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মিম, রিল, শর্ট ভিডিও, ইনস্টাগ্রাম পোস্ট— এগুলোই এখন মত প্রকাশের নতুন মাধ্যম। ককরোচ আন্দোলন দেখিয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেও জনমত তৈরি করা সম্ভব। E20 পার্টিও সেই পথেই হাঁটছে। যদিও এই আন্দোলনের শক্তি এখন মূলত অনলাইনেই সীমাবদ্ধ।

একদিকে সরকার বলছে— E20 ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন— যদি সত্যিই এটি ভালো হয়, তাহলে মানুষকে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। এখানেই মূল বিতর্ক। বাধ্যতামূলক নীতি, না কি ভোক্তার স্বাধীনতা? বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাজনীতি— তিনটি বিষয়ই এখানে একসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

ককরোচ জনতা পার্টির পর E20 জনতা পার্টির উত্থান দেখিয়ে দিচ্ছে— ভারতের ডিজিটাল রাজনীতির চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। আগে প্রতিবাদের কেন্দ্র ছিল রাজপথ। এখন তার বড় অংশ তৈরি হচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা আর নীতিগত পরিবর্তন— এই দু’টি এক বিষয় নয়। E20 নিয়ে বিতর্ক যে আরও বাড়বে, তা স্পষ্ট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বৈজ্ঞানিক তথ্য, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং জননীতির উপর— শুধুমাত্র অনলাইন ট্রেন্ডের উপর নয়। আপনি কি মনে করেন, E20 জ্বালানির পাশাপাশি ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ পেট্রোল কেনার বিকল্পও সাধারণ মানুষের জন্য রাখা উচিত? নাকি পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে E20-ই ভবিষ্যতের পথ? ‘গড়কড়ি পদত্যাগ করুন’—এই দাবি কি কেবলই ইন্টারনেটের একটি কৌতুক হিসেবেই থেকে যাবে, নাকি এটি আরও বড় কোনো আন্দোলনে রূপ নেবে, সেটাই এখন দেখার।