ভোটে হারতেই মোহভঙ্গ!

রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া নাকি একেবারে সন্ন্যাস নিচ্ছেন পবিত্র কর ?

স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : একে একে খালি হচ্ছে তৃণমূলের ঘর। শুভেন্দু অধিকারীর তীরে ঘায়েল পবিত্র কর। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সস্ত্রীক পদ ছাড়লেন নন্দীগ্রামের মাস্টারমশাই। রাজনৈতিক হেনস্থার ভয়ে কি আপাতত রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া নাকি একেবারে সন্ন্যাস নিচ্ছেন পবিত্র কর। এইতো সেদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর গলায়মালায় ছবি দেখা গেল। তবে কি ভোটে হারতেই মোহভঙ্গ। নাকি চাপ তৈরি হচ্ছিল তাঁর উপর।

নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ডানহাত বলেই পরিচিত ছিলেন পবিত্র কর। নামের মতোই সম্পর্কেও ছিল অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই। ২৬ শের বিধানসভা ভোটের মুখে শুভেন্দুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে তৃণমূলে যোগ দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। শুভেন্দু অধিকারীকে নন্দীগ্রামে কুপোকাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সে আর হল কই। শুধু পবিত্র কর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে তৃণমূল। তাই কি পরাজয়ের কারণেই অন্যান্য তৃণমূল নেতাদের মতো তিনিও দলে অক্সিজেনের অভাববোধ করছেন। গত ৪ ঠা মে ভোটের ফল প্রকাশ হয়েছে আর গত ১৫ মে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের বিডিও-র কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এই দম্পতি। প্রশাসনিকভাবে পরবর্তী পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তৃণমূলের হয়ে বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করলেও, পবিত্র কর ও শিউলি কর আসলে পঞ্চায়েত স্তরে বিজেপির টিকিটে জিতেছিলেন। নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের বয়াল-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ১২ নম্বর বুথ থেকে জয়ী হয়ে সদস্য ছিলেন পবিত্র কর। অন্যদিকে, একই পঞ্চায়েতের ৭ নম্বর বুথ থেকে জিতে প্রধানের চেয়ারে বসেন তাঁর স্ত্রী শিউলি কর। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তে এই দম্পতি বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তৃণমূলের টিকিটে পবিত্র কর নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হলেও, এতদিন কেউই পঞ্চায়তের সদস্যপদ বা প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেননি। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর। ভোটের ফলাফল প্রকাশ এবং রাজ্যে সরকার বদলের পরেই এই দম্পতি তাঁদের অসুস্থতার কথা জানিয়ে তড়িঘড়ি পদ ছাড়ার আবেদন জানান। রাজনৈতিক মহলের মতে, পরাজয়ের গ্লানি এবং রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতা দখলের পরই আইনি ও রাজনৈতিক চাপ এড়াতে এই ইস্তফার সিদ্ধান্ত। নির্বাচনী প্রচারের সময় নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থীকে নিয়ে সুর চড়িয়েছিলেন স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জনসভা থেকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, আমিও একসময় তৃণমূলে ছিলাম। কিন্তু দল ছাড়ার সময় সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তবেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলাম। অথচ আমার বিপরীতে যিনি দাঁড়িয়েছেন, তিনি দলবদল করলেও এখনও বিজেপির টিকিটে জেতা পঞ্চায়তের সদস্যপদ ছাড়েননি। শুভেন্দু অধিকারী আইনি পদক্ষেপেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। আর ভোটের রেজাল্ট বেরনোর পরই দেখা গেল চেয়ার ছাড়লেন এই কর দম্পত্তি। এবার তাঁদের যাত্রাপথ কোথায়। তা নিয়ে এখনও কোনও আভাস মেলেনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণ যখন দেখিয়েছেন তখন তাঁরা বিশ্রমেই যাচ্ছেন। কিন্তু নিন্দুকদের তো আর মুখে কিছু আটকায় না। তাঁরাও বলতে শুরু করেছে বিপুল ভোটে হারার কারণেই তড়ঘড়ি এই সিদ্ধান্ত। পবিত্র কর তৃণমূল স্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এক লড়াকু নেতা।

তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল তৃণমূলের হাত ধরেই। ২০১৮ সালে তিনি ছিলেন নন্দীগ্রামের বয়াল-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। তবে ২০২০ সালের শেষভাগে, যখন শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন, তখন তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুগামী হিসেবে পবিত্র করও সদলবলে পদ্ম শিবিরে নাম লেখান। ২০২১-এর হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর জয়ের নেপথ্যে যে ক’জন কারিগরের নাম উঠে আসে, তাঁদের মধ্যে পবিত্র কর অন্যতম। তাই ২৬ শের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁর আইপ্যাকের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ফাঁস হতেই ফাটল মেরামতের চেষ্টা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর হাত ছেড়ে পবিত্র কর তৃণমূল শিবিরেই নাম লেখান।

কিন্তু কথায় আছে না অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়ে যায়। নন্দীগ্রামে তো পবিত্র কর যেমন ধরাশায়ী হলেন শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তেমনি আবার বাংলায় তৃণমূলের রাজ্যপাটও গেল। তাই অনেকেই বলছেন ডাঙায় থেকে তো আর কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। তাই হয়তো ভোটের রেজাল্ট দেখেই গতিপথ পরিবর্তন করলেন পবিত্র কর ও তাঁর স্ত্রী। এবার কর দম্পত্তির পরবর্তী গন্তব্য কি হয় তাই এখন নজরে।