ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্র্যাফিক এই সমুদ্রতল কেবলের মাধ্যমেই আদান-প্রদান হয়।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগর (Strait of Hormuz, Red Sea) ঘিরে আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরানের সংঘাত ক্রমেই জটিল আকার নিচ্ছে। যুদ্ধের আবহে এবার নতুন এক অদৃশ্য বিপদের আশঙ্কা সামনে আসছে—সমুদ্রের তলদেশে থাকা ফাইবার-অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করা এই কেবলগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাবমেরিন কেবল ছাড়া বৈশ্বিক যোগাযোগ কার্যত অচল। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (International Telecommunication Union) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্র্যাফিক এই সমুদ্রতল কেবলের মাধ্যমেই আদান-প্রদান হয়। ফলে এই পরিকাঠামোর উপর যে কোনও ধরনের হামলা বা ক্ষতি বিশ্ব অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও ইরান সরাসরি এই কেবল পরিকাঠামোকে নিশানা করার হুমকি দেয়নি, তবুও হুথিদের (Houthis) মতো গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী অতীতে একাধিকবার লোহিত সাগরে ফাইবার-অপটিক কেবল কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ফলে যুদ্ধের আবহে সেই আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্র্যাফিক মুম্বই থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ইউরোপগামী কেবল লাইনের উপর নির্ভরশীল। বাকি অংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় রুটে যায়। অর্থাৎ ভারতের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় অংশই এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগর দিয়ে প্রায় ১৭টি সাবমেরিন কেবল গিয়েছে। প্রতিটি কেবল ফাইবার-অপটিক কোর, তামার তার ও সুরক্ষামূলক আবরণ দিয়ে তৈরি, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য পরিবহন করে। একটি কেবল স্থাপন করতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। ফলে এই পরিকাঠামোর ক্ষতি হলে তা দ্রুত মেরামত করা সহজ নয়।
তবে কোনও একটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গোটা ইন্টারনেট ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না। কারণ, ইন্টারনেট একাধিক বিকল্প রুটের মাধ্যমে কাজ করে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন ট্র্যাফিক অন্য রুটে সরিয়ে নিতে হয়। তখন সেই রুটগুলিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যার ফলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে।

একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাইটস্টর্ম টেলিকম কানেকটিভিটি প্রাইভেট লিমিটেডের চিফ এক্সিকিউটিভ অ্যান্ড ম্যানেজিং ডিরেক্টর অমজিত গুপ্ত জানাচ্ছেন, “ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না, তবে গতি কমে যেতে পারে।” দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ চলতে থাকলে ‘চোক এফেক্ট’ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যবহারকারীরা নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। যেমন—অনলাইন লেনদেনে দেরি, ভিডিও স্ট্রিমিংয়ে বাফারিং বেড়ে যাওয়া, ডাউনলোড-আপলোডের গতি কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অ্যাপের প্রতিক্রিয়ায় দেরি। বিশেষ করে বহুজাতিক সংস্থা বা গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টারগুলির কাজেও প্রভাব পড়তে পারে।
সবমিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু স্থল বা আকাশে সীমাবদ্ধ নয়—সমুদ্রের নীচেও তার প্রভাব পড়তে পারে, অন্তত এমনই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর সেই অদৃশ্য সংকটই ভবিষ্যতের ডিজিটাল বিশ্বকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।