AI Impact Summit : ১০ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নির ঘোষণা !

“এআই-কে Global Common Good হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে Global South-এর উন্নয়নে। তিনি সতর্ক করে বলেন- ডিপফেক, ভুয়ো কনটেন্ট, বিভ্রান্তি তৈরি করে। এআই-এর অপব্যবহার সমাজে অস্থিরতা আনতে পারে।”

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানব ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এ এই বার্তাই দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিশ্বনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে মোদী বলেন- “Artificial Intelligence marks a transformative chapter in human history. India is not just a part of the AI revolution, but is leading and shaping it.” এআই-কে গণতান্ত্রিক করার ডাক দেন তিনি। ঘোষণা করেন ভারতের ‘MANAV Vision’।

কিন্তু ঠিক সেই সময়, ভেন্যুর বাইরে গেট বন্ধ, মেট্রো বন্ধ এবং ট্রাফিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে। একদিকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের দাবি, অন্যদিকে সাধারণ অংশগ্রহণকারীর ভোগান্তি।

বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান

দিল্লির ভারত মণ্ডপমে এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধান।


ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট Luiz Inacio Lula da Silva
জাতিসংঘের মহাসচিব Antonio Guterres
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী Tshering Tobgay
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট Anura Kumara Disanayaka
মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী Navinchandra Ramgoolam
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী Andrej Plenkovic
সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট Aleksandar Vucic
এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট Alar Karis
ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী Petteri Orpo

উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব, টাটা সন্সের চেয়ারম্যান Natarajan Chandrasekaran, অ্যানথ্রপিক সিইও Dario Amodei। সরকারের বার্তা স্পষ্ট- ভারত এআই দুনিয়ায় নেতৃত্ব নিতে প্রস্তুত।

বিল গেটস অনুপস্থিতি ঘিরে জল্পনা

এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে আরেকটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন মাইক্রোসফ্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা Bill Gates। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শুরু হয় জল্পনা। সরকারি সূত্রে প্রথমে জানানো হয়- বিল গেটস নাকি সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। কারণ হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়, প্রয়াত অপরাধী Jeffrey Epstein-এর ফাইল সংক্রান্ত বিতর্কে তাঁর নাম উঠে আসায় অস্বস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই চিত্র পাল্টে যায়। গেটস ফাউন্ডেশনের এক মুখপাত্র স্পষ্ট করে জানান-“Bill Gates is attending the AI Impact Summit. He will be delivering his keynote as scheduled.” এআই সামিটের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রথমে স্পিকার তালিকায় বিল গেটসের নাম ছিল। তিনি ১৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ১২ মিনিটের মূল বক্তব্য দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত ছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ সেই নাম উধাও হয়ে যায় কী পার্টিসিপ্যান্ট লিস্ট থেকে। এই ঘটনাই বাড়িয়ে দেয় জল্পনা। এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “Who’s attending, who’s not attending- that’s personal choice. I would not like to comment.”

মার্কিন বিচার দফতরের প্রকাশিত নথিতে এপস্টেইনের একটি অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে বিল গেটস সম্পর্কে একটি দাবি করা হয়েছিল। যদিও এপস্টাইনের কোনও ভুক্তভোগী গেটসের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনেননি। গেটসের মুখপাত্র আগেই সেই অভিযোগকে “absolutely absurd” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই বিতর্কের মাঝেই বিল গেটস সোমবার ভারতে পৌঁছন। তাঁর প্রথম গন্তব্য ছিল বিজয়ওয়াড়া। সেখানে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী N Chandrababu Naidu, উপ-মুখ্যমন্ত্রী K Pawan Kalyan-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অর্থাৎ, সরকারি স্তরে তাঁর সফরসূচি সচল ছিল। প্রশ্ন উঠছে- যদি তিনি উপস্থিত থাকেন, তবে সরকারি সূত্রে ভিন্ন বার্তা কেন? ওয়েবসাইট থেকে নাম সরানো হল কেন? এটি কি কেবল সমন্বয়ের অভাব,না কি বিতর্ক এড়ানোর চেষ্টা? একদিকে বিশ্বমানের এআই সম্মেলন, অন্যদিকে অংশগ্রহণকারীদের নাম নিয়েই বিভ্রান্তি।

‘MANAV Vision’: ভারতের এআই দর্শন

মোদি তাঁর ভাষণে বলেন এআই যেন মানুষকে “ডেটা পয়েন্ট” বানিয়ে না ফেলে। তিনি তুলে ধরেন MANAV Vision এর কথা-

M — Moral & Ethical Systems

নৈতিক ভিত্তিতে গড়া এআই।

A — Accountable Governance

স্বচ্ছ নীতি, জবাবদিহিমূলক কাঠামো।

N — National Sovereignty

“Whose data, his right.”

A — Accessible & Inclusive

এআই একচেটিয়া নয়, সবার জন্য উন্মুক্ত।

V — Valid & Legitimate

আইনসম্মত ও যাচাইযোগ্য প্রযুক্তি।

মোদী বলেন- এআই-কে “Global Common Good” হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে Global South-এর উন্নয়নে। তিনি সতর্ক করে বলেন- ডিপফেক, ভুয়ো কনটেন্ট, বিভ্রান্তি তৈরি করে। এআই-এর অপব্যবহার সমাজে অস্থিরতা আনতে পারে।

ভবিষ্যৎ বনাম বর্তমান প্রয়োগ

মোদী বলেন “চ্যালেঞ্জ এটা নয় যে এআই ভবিষ্যতে কী করবে, বরং আজ আমরা কীভাবে অর্থপূর্ণভাবে এআই-এর প্রয়োগ করছি, সেটাই আসল।” ভারত নিজেকে এমন দেশ হিসেবে তুলে ধরছে যে দেশ নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, আবার দ্রুত তা অভিযোজিতও করতে পারে। তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাসকে তিনি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন।

বাস্তবের চিত্র: সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়

কিন্তু সম্মেলনের বাইরের ছবি ছিল ভিন্ন। এক সোশ্যাল মিডিয়া ডেভেলপার X হ্যান্ডেলে লেখেন- তিনি ভেন্যু থেকে বেরিয়ে ৬ কিলোমিটার হেঁটে পরিবহন পেয়েছেন। তার পোস্টে লেখা- “VIP movement-এর জন্য ৬ কিমি হাঁটতে হয়েছে।” অভিযোগ:

গেট নম্বর ১০ বন্ধ
এক্সিট বদলে দেওয়া হয়েছে
মেট্রো পরিষেবা বন্ধ
কয়েক কিলোমিটার হাঁটা
ট্রাফিক জ্যাম

দ্বৈত বার্তা

একদিকে:

এআই গণতন্ত্রীকরণের আহ্বান
মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তির কথা
গ্লোবাল কমন গুডের দাবি
বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি

অন্যদিকে:


ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা
সাধারণ অংশগ্রহণকারীর ভোগান্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা

এটাই এখন আলোচনার মূল বিষয়। ভারত বলছে ২১ শতকের এআই-ভিত্তিক বিশ্বে মানবকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র হবে ‘MANAV Vision’। প্রশ্ন এখন দুটি: নীতিগতভাবে কি ভারত এআই-তে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারবে? সেই নেতৃত্বের দাবি কি বাস্তব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে? এআই বিপ্লব কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়- বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণেরও প্রশ্ন। ভারত যদি সত্যিই এআই-কে গণতান্ত্রিক করতে চায়, তাহলে প্রযুক্তির পাশাপাশি আয়োজনেও সেই গণতন্ত্রের ছাপ থাকতে হবে।