ভাঙড়ে নওশাদ সিদ্দিকীর গাড়িতে হামলা, উত্তপ্ত রাজনীতি—রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ আইএসএফের।

বিশ্বজিত নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচনী প্রচার ঘিরে ফের অশান্তির ঘটনা সামনে এল। আইএসএফ (ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট)-এর প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকীর গাড়ির উপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শনিবার সন্ধ্যায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ভাঙড়ের চড়িস্বর এলাকায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতভর উত্তপ্ত থাকে এলাকা, শুরু হয় বিক্ষোভ ও অবরোধ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকের চড়িস্বর এলাকায় শনিবার সন্ধ্যায় একটি নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখছিলেন নওশাদ সিদ্দিকী। মঞ্চে তিনি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, আর ঠিক সেই সময় মঞ্চের পাশেই রাখা ছিল তাঁর গাড়ি। অভিযোগ, সভা শেষ হওয়ার আগেই রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা গাড়িটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আচমকা কয়েকজন ব্যক্তি গাড়ির দিকে ইট ছুঁড়তে শুরু করে। এই ইটের আঘাতে গাড়ির পেছনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কাঁচ ভেঙে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সভাস্থলে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও বড় ধরনের কোনও শারীরিক ক্ষতির খবর মেলেনি, তবে ঘটনাটি ঘিরে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকী। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে এই হামলার পেছনে তৃণমূল কংগ্রেসের মদত রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “পরিকল্পিতভাবে আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে আমরা নির্বাচনী প্রচার করতে না পারি। কিন্তু এই ধরনের হামলায় আমরা পিছিয়ে পড়ব না।” তিনি দ্রুত দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানান এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এলাকায় তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে এবং আশেপাশের পরিস্থিতির উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ঘটনার প্রতিবাদে দ্রুত রাস্তায় নেমে পড়েন আইএসএফের কর্মী-সমর্থকেরা। ভাঙড়ের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানো হয়। ফলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। বিক্ষোভের জেরে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই বিক্ষোভের প্রভাব পড়ে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের উপরও। ঘটকপুকুর এলাকায় বিক্ষোভের মুখে আটকে পড়েন ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বাহারুল ইসলাম। তাঁর গাড়ি কিছু সময়ের জন্য আটকে থাকে বলে জানা যায়। পরে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে যথেষ্ট তৎপরতা দেখাতে হয়। সম্ভাব্য অশান্তি এড়াতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে এবং কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাদের দাবি, এই ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তৃণমূলের একাংশ নেতাদের মতে, নির্বাচনের আগে সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে এই ঘটনাকে বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।
ভাঙড় অঞ্চলটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বলে পরিচিত। নির্বাচনের সময় এখানে প্রায়ই উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা সামনে আসে। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাধারণ মানুষের একাংশ এই ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তাদের মতে, নির্বাচনের সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ধরনের সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সব মিলিয়ে, নওশাদ সিদ্দিকীর গাড়িতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাঙড়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ কত দ্রুত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারে এবং পরিস্থিতি কতটা দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।