আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই রাজনৈতিক ধাক্কাই ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (GTRI) প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব। তাঁর মতে, আগামী দু’মাসের মধ্যেই এই চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
বৃহস্পতিবার সংবাদসংস্থা ANI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, নির্বাচনে খারাপ ফলের পর ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইতে পারেন। তাই ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি প্রত্যাশার আগেই সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর কথায়, দুই দেশের শীর্ষ আধিকারিক ও মন্ত্রীরা ইতিমধ্যেই একাধিকবার বৈঠক করেছেন। আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও কিছু বিষয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে রিপাবলিকানদের একক নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের মাঝপথে বড় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব দেখাতে চাইবেন। আর সেই কারণে ভারতের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি করতে উদ্যোগী হতে পারেন তিনি।
এদিকে, রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর হুমকিও আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর দাবি, চুক্তিতে রাজি করাতে ভারতীয় পণ্যের উপর আরও ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর হুমকি দিতে পারে আমেরিকা। এর আগে আরও বেশি শুল্কের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সময়সীমা নিয়ে অজয় শ্রীবাস্তব জানান, প্রস্তাবিত গ্রাহাম অ্যাক্টকে ঘিরে আগে মনে করা হয়েছিল, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমেরিকার প্রশাসনের প্রায় ৬০ দিন সময় লাগবে। সেই সময়সীমার কিছুটা ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গিয়েছে। তাই আগামী দু’মাসের মধ্যে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে বলে তাঁর আশা।
তবে GTRI-র সাম্প্রতিক রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, নির্বাচনে ট্রাম্পের ধাক্কা লাগলেও আমেরিকার বাণিজ্যনীতি খুব একটা বদলাবে না। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তিতে ভারতকে শুল্ক কমাতে হতে পারে। কিন্তু আমেরিকা নিজেদের নিয়মিত ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ বা MFN শুল্ক বহাল রাখতে পারে। এছাড়াও, ভারতের তরফে কিছু পণ্য কেনা এবং নির্দিষ্ট নীতিগত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তিতে থাকতে পারে। পাশাপাশি আমেরিকার অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
GTRI-র আশঙ্কা, প্রস্তাবিত চুক্তির কিছু শর্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা WTO-তে ভারতের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় ভারতের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকা নিজের হাতে শুল্ক বাড়ানোর ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কায় ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও আমেরিকার কড়া বাণিজ্যনীতি যে বদলে যাবে, তেমনটা মনে করছে না GTRI।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও আমেরিকা পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করেছিল। পাশাপাশি বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বা BTA নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছিল দুই দেশ। এরপর জুন মাসে আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে নয়াদিল্লি আসেন। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে বৈঠকে BTA-র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পর্যালোচনা করা হয়। অন্তর্বর্তী চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে ভারত আমেরিকায় মোট ১০৩.৮২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। অন্যদিকে, আমেরিকা ভারতকে প্রায় ৪৫.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। দুই দেশের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯.৪২ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে দুই দেশের মধ্যে পরিষেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯২.২৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারত আমেরিকায় ৪৮.৬৭ বিলিয়ন ডলারের পরিষেবা রফতানি করেছে এবং আমেরিকা ভারতকে ৪৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারের পরিষেবা দিয়েছে।