Angel Chakma Murder : চাইনিজ বলে কটাক্ষ থেকে শুরু করে গালিগালাজ হাতাহাতি। দায় এড়িয়ে যাচ্ছে পুলিশ। বিজেপির এলাকা বলেই তড়িঘড়ি হস্তক্ষেপ মানবাধিকার কমিশনের? ফের প্রকাশ্যে বিজেপির ঘৃণ্য রাজনীতি।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ২০২৫ সাল শেষ করে ২০২৬ সালে পা রেখেছি আমরা। এমন সময়েও যদি কাউকে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয় তাহলে তার থেকে লজ্জার আর কিই বা হতে পারে?

গত ৯ ডিসেম্বর দেরাদুনের সেলাকুই এলাকায় স্থানীয় বাজারে গিয়েছিলেন অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ছোট ভাই মাইকেল চাকমা। অভিযোগ, সেখানে জনা ছয়েক যুবক তাঁদের রাস্তা আটকে বর্ণবিদ্বেষী কটুক্তি করে। দুই ভাইকে চাইনিজ বলে কটাক্ষ ও গালিগালাজ করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অ্যাঞ্জেল ওই যুবকদের বলেন, ”আমরা চিনা নই, আমরা ভারতীয়। সেটা প্রমাণ করতে আপনাদের কোন নথি দেখাতে হবে?” এরপরই পরিস্থিতি লাগামছাড়া আকার নেয়। দুই ভাইয়ের উদ্দেশে রীতিমত গালিগালাজ করা হয় এর পাশাপাশি তাঁদের উপর হামলা চালানো হয়। বেধড়ক মারধর করেই থামেনি হামলাকারীরা। ছুরির কোপ মারা হয় দুজনের উপর। অ্যাঞ্জেলের ঘাড় ও মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে। গুরুতর জখম হন মাইকেল। দেরাদুনের হাসপাতালে দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার মৃত্যু হয়েছে অ্যাঞ্জেলের। আশঙ্কাজনক তাঁর ভাই মাইকেলও। শনিবার অ্যাঞ্জেলের দেহ দেরাদুন থেকে আগরতলা নিয়ে আসার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ত্রিপুরার নাগরিকরা। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হল – হামলাকারীদের চাকমা বলেছিলেন আমিও ভারতীয়।

মৃত পড়ুয়ার বাবার হাহাকার কার্যত চোখে দেখা যায় না। ছেলের এভাবে হারিয়ে তার এখন একটাই দাবি তাঁর পুত্রের সঙ্গে যা ঘটেছে, এমন ঘটনা যেন আর কারও সঙ্গে না ঘটে। কোনও বাবা যেন এভাবে তাঁর সন্তানকে না হারান। এই ঘটনায় পুলিশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এটি কোনও জাতিগত আক্রমণ বা হামলার ঘটনা নয়। যদিও সেই দাবি নাকচ করে দিল নিহত তরুণের পরিবার। পুলিশের বিরুদ্ধে দায়সারা তদন্ত এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অস্বীকার করার অভিযোগও তুললেন তাঁরা। সেইসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন অ্যাঞ্জেলের ভাই মাইকেল। তাঁকেও বেধড়ক মারধর করে অভিযুক্তরা। অথচ তাঁর বয়ানই অস্বীকার করছে পুলিশ! একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কথা শোনার পরিবর্তে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই জনসমক্ষে বিবৃতি দিচ্ছে পুলিশ এমন অভিযোগ পরিবারের। আবার পুলিশের দাবি, “বিষয়টি নিয়ে একটা মিথ্যা তথ্য প্রচার করে এমন ভাবে দেখানো হচ্ছে, যার জেরে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, উত্তর-পূর্বের পড়ুয়াদের আক্রমণ করা হচ্ছে। কিন্তু এমন কোন বিষয় আমরা তদন্তে পাইনি এখনও।“

এমন ব্যাখ্যায় ক্ষুব্ধ উত্তরাখণ্ড পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে অল ইন্ডিয়া চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। সংগঠনের সভাপতি দৃশ্যমণি চাকমার অভিযোগ, পুলিশ প্রথম থেকেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ৯ ডিসেম্বর ঘটনাটি ঘটলেও পুলিশ এফআইআর নিতে ১২ তারিখ পর্যন্ত সময় নষ্ট করেছে। অভিযোগ, পুলিশের এই গাফিলতির সুযোগ নিয়েই এক মূল অভিযুক্ত ফেরার হয়ে গিয়েছে, যার খোঁজ এখনও মেলেনি। আবার অন্যদিকে এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও। দেরাদুনের জেলাশাসক ও সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশকে নোটিস পাঠানো হল কমিশনের তরফে৷ ঘটনার তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে তাঁদের৷ পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মামলার পুঙ্খনাপুঙ্খ তদন্তের রিপোর্ট উত্তরাখণ্ডের মুখ্যসচিব এবং ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশের কাছে পাঠানোরও নির্দেশ দিয়েছে। ওড়িশায় যখন জুয়েল রানার প্রাণ চলে যায় তখন মানবাধিকার কমিশনের এই তৎপরতা কোথায় থাকে? উঠছে প্রশ্ন।

সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী লিখেছেন, ‘অ্যাঞ্জেল চাকমা ও তাঁর ভাই মিশেলের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা ভয়াবহ ঘৃণার নিদর্শন। ঘৃণা একদিনে প্রকাশ পায় না। বছরের পর বছর ধরে তরুণদের মাথায় বিষাক্ত তথা দায়িত্বজ্ঞানহীন বিষয়বস্তু ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এই বিদ্বেষপ্রবণতাকে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্ব স্বাভাবিক বিষয় করে তুলেছে।’ রাহুল আরও লিখেছেন, ভারত শ্রদ্ধা ও ঐক্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, ভয় ও ঘৃণার ভিত্তিতে নয়। চাকমা পরিবার এবং ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানাচ্ছি ।’ একইসুরে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর, সমাজবাদী পার্টি সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব সহ অন্যান্য বিরোধী নেতারাও। এই যে পুলিশের উদাসীনতা এরকম একটা ঘটনাকে ছোট ঘটনা বলা, জাতিবিদ্বেষের বিষয়টাকেই এড়িয়ে যাওয়া এটা মানা যায় না একেবারেই। এই দেশে যদি এঞ্জেল চাকমার জন্য জাস্টিস চাওয়া হয় মানবাধিকার কমিশন হস্তক্ষেপ করতে পারে তাহলে জুয়েল রানার প্রাণও গিয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যেই। তাহলে কি এটা বলা যায় বিজেপি আজকাল সিলেক্টিভ প্রতিবাদ করে? মুসলিমদের প্রাণ গেলে বিজেপির কিছু যায় আসে না তাহলে? প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।