ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক কারখানার নিরাপত্তারক্ষী বজেন্দ্র বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা। অভিযুক্ত আনসার সদস্য নোমান মিয়াকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই নিয়ে গত কয়েকদিনে তিন হিন্দুর প্রাণহানি বাংলাদেশে। আবার বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ঢাকায় তলব করল ইউনুস সরকার। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কমাতে চাইছে বাংলাদেশ।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ইউনুসের বাংলাদেশে ফের হিন্দু নিধন। এবার প্রাণ হারালেন বজেন্দ্র বিশ্বাস। তিনি পেশায় একজন আনসার সদস্য ছিলেন। আনসার হল বাংলাদেশের একটি আধাসামরিক বাহিনী। সিলেট সদর উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বজেন্দ্র। জানা গিয়েছে, তাঁর সহকর্মীর বন্দুকের গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছেন বজেন্দ্রবাবু। ঘটনায় নোমান মিঞাঁ নামে এক আনসার সদস্যকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তার বন্দুকের গুলিতেই আহত হয়েছিলেন বজেন্দ্র বিশ্বাস। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। সন্ধ্যা নাগাদ একসঙ্গেই বসেছিলেন দু’জনে। তখন নোমানের বন্দুক থেকে নাকি ‘ভুল করে’ গুলি গিয়ে লাগে বজেন্দ্র বিশ্বাসের শরীরে। জানা গিয়েছে, বজেন্দ্র বিশ্বাসের বাঁ ঊরুতে লেগেছিল সেই গুলি। রক্তপাত হতে থাকে এর জেরে। তারপরই সহকর্মীরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেই সময় বজেন্দ্র বিশ্বাসের শারীরিক পরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান, তিনি আর বেঁচে নেই। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। তদন্ত শুরু হয়, ধৃত নোমানের দাবি সে নাকি মজা করছিল। তখন তার শটগান থেকে গুলি চলে যায়। তা গিয়ে লাগে বজেন্দ্র বিশ্বাসের গায়ে। অসাবধানতার জেরেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে নোমান। যদিও তার দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপনি এখনও বলবেন ইউনুস আপনার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা নিরাপদে, দীপু অমৃত এবার বজেন্দ্র আর কত সংখ্যালঘু হিন্দুর রক্ত দেখে আপনি শান্ত হবেন? আপনি কি এটাই চাইছেন হিন্দু বর্জিত বাংলাদেশ? মৌলবাদের বাংলাদেশে হিন্দুত্বের কোন স্থান থাকবে না তাহলে? এখনও চুপ করে থাকবেন? এখনও বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতার স্বপন দেখবেন? আপনার লোভের জেরে আর কত হিন্দুর প্রাণ যাবে? অন্যদিকে এই চূড়ান্ত কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতকে জরুরি তলব ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের। কেন তাঁকে হঠাৎ এভাবে তলব করা হল তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে দুই দেশের কূটনৈতিক সংঘাতের মাঝে এই পদক্ষেপ নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে শুরু করেছে। জানা যাচ্ছে, ইউনুসের ডাকে সাড়া দিয়ে তড়িঘড়ি দিল্লি থেকে ঢাকা পৌঁছন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লা। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে গত এক বছর ধরেই ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন চলছে। সেই টানাপোড়েন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে গত দু’সপ্তাহে। বাংলাদেশের এক শ্রেণির নেতাদের ভারতবিরোধী মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চাপানউতর বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পড়শি দেশের তরুণ নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পরে তা আরও বৃদ্ধি পায়। হাদির মৃত্যু ঘিরে ফের উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ।
অশান্তি ছড়ায় পড়শি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। চলে ভাঙচুর, তাণ্ডব, এমনকি অগ্নিসংযোগও। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই ময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। কূটনৈতিক মহলে বিগত বহুদিন ধরে আলোচনা চলছে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সঙ্কুচিত করতে চায়। এ ব্যাপারে সে দেশের বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। মনে করা হচ্ছে দিল্লিতে কর্মরত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে সেই কারণেই তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ধরার দাবিতে প্রতিবাদ করা ইনকিলাব মঞ্চ সম্প্রতি দাবি করেছিল, ভারতের সঙ্গে যেন বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তবে চাপের মুখে থাকলেও এখনই ইউনুস সরকার এই ধরনের কোনও পদক্ষেপ করার ইঙ্গিত দেয়নি। তড়িঘড়ি হাইকমিশনারকে ডেকে তো পাঠানো হল তারপর কি হল? উপদেষ্টার পরিষদের বিশেষ বৈঠক শেষে একসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। উপদেষ্টাদের আগেই মন্ত্রণালয়ে আসেন হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ। প্রায় আধঘণ্টা পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দফতরে হাইকমিশনাকে নিয়ে বৈঠক করেন দুই উপদেষ্টা। বৈঠক শেষে নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে হাইকমিশনাকে ডেকে আনি। আলোচনা করি। পরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মন্ত্রণালয় থেকে বের হওয়ার সময় বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বৈঠক নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এটা একেবারে স্পষ্ট যে এই মুহূর্তে দিল্লির ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে ইউনুস সরকার। ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান উসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।হাদির সংগঠনের তরফে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের কাজের অনুমতি বা ‘ওয়ার্ক পারমিট’ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংগঠনটির যুক্তি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে এই পদক্ষেপ করা জরুরি। এই তলব এবং প্রায় গোপন বৈঠক এর সঙ্গে যুক্ত বলেই মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল দিল্লি। তবে ভারতের সেই বক্তব্যকে ‘অতিরঞ্জিত’ আখ্যা দিয়েছিল ইউনূস সরকার। জবাবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছিল, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ২৯০০ ঘটনা ঘটেছে বিগত দেড় বছরে। এরপর ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় পালটা নিন্দা জানায় বাংলাদেশ। নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা না দিতে পেরে ভারতের ওপর পালটা চাপ সৃষ্টির এই কৌশল অবলম্বন করে ঢাকা। এছাড়া সীমান্তে চোরাচালান, বাংলাদেশি নেতাদের ‘সেভেন সিস্টার্স ভাগ’ নিয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্য সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে চিড় আরও গভীর হয়েছে এই কয়েকদিনে।
সম্প্রতি সাত দিনের মধ্যে দু’বার বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে তলব করেছিল দিল্লি। বাংলাদে-ভারতর এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এবার ঢাকায় ডাক পড়ল দিল্লিতে নিযুক্ত হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার তাদের দিল্লি এবং কলকাতা সহ ভারতের একাধিক কেন্দ্র থেকে ভিসা প্রদান বন্ধ রেখেছে। এ ছাড়া অন্যান্য কনস্যুলার সার্ভিসও সীমিত করেছে পড়শি দেশটি। যদিও ভারত বাংলাদেশেত মত নীচু কাজ করেনি ভারতের তরফে এখনও মেডিকেল ভিসা আগের মতই দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে অতীতে যাদের ভিসা দেওয়া হয়েছে সেগুলির মেয়াদ আর অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বৃদ্ধি করা হচ্ছে না।পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে অনেকের ধারণা দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভারত পাকিস্তানের মতোই নিয়মতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কূটনৈতিক মিশন খোলা রাখলেও সেগুলিকে খুব বেশি সক্রিয় করা হবে না। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের বক্তব্য, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি দূরে থাক আরও অবনতি হতে পারে। সরকারের পাশাপাশি একাধিক দল ভারত বিরোধী সুর আরো চলা করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।