সময়ের এই পালাবদল যেন আজকের পরিস্থিতিকে আরও বেশি করে বিদ্রূপাত্মক করে তুলেছে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ক্যানিং পূর্বের রাজনীতির আকাশে যেন হঠাৎই জমে উঠেছে অদ্ভূত এক দ্বন্দ্বের মেঘ। যেখানে দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষকেই কি আজ মেনে নিতে হবে বন্ধু হিসেবে? সময়ের এমন অদ্ভূত মোড়েই দাঁড়িয়ে রয়েছে সিপিএমের অন্দরমহল। আর এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই নাম আরাবুল ইসলাম। একসময় তৃণমূলের হয়ে লড়ে উঠে আসা এই বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজ আইএসএফের পতাকার ছায়ায়। আর সেইখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা। ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রের প্রার্থী আরাবুল ইসলাম। তবে জোটের সমীকরণ মেনে সিপিএমকেও তাঁর পাশে দাঁড়াতে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যাঁর সঙ্গে বছরের পর বছর রাজনৈতিক সংঘাত তাঁকেই কি আজ সমর্থন করা সম্ভব? সিপিএমের নিচুতলার বহু নেতা-কর্মীর কাছে এই সমীকরণ একেবারেই অস্বস্তিকর।
এই অস্বস্তির শিকড় অনেক গভীরে। ২০১৩ সালে ভাঙড়ের কাঁটাতলায় তৎকালীন সিপিএম নেতা রেজ্জাক মোল্লার উপর হামলার অভিযোগ ওঠে আরাবুলের বিরুদ্ধে। শুধু তই নয় বাম কর্মীদের মিছিলের গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ একাধিক ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছে। সেই ঘটনার জেরে জেলও খাটতে হয়েছিল তাঁকে। রাজনীতির মাঠে এই সংঘাত কেবল মতাদর্শের ছিল না ছিল সরাসরি রাস্তায় নামা শক্তির লড়াই। কিন্তু রাজনীতির চাকা ঘুরেছে। ২০১৬ সালে সেই রেজ্জাক মোল্লাই সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন এবং মন্ত্রীও হন। সময়ের এই পালাবদল যেন আজকের পরিস্থিতিকে আরও বেশি করে বিদ্রূপাত্মক করে তুলেছে। যাঁদের সঙ্গে লড়াই করে উঠে আসা তাঁদের সঙ্গেই আজ সমীকরণের খাতিরে হাত মেলানোর সম্ভাবনা। এ যেন রাজনীতির এক নির্মম বাস্তবতা।

সিপিএমের স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা কোনওভাবেই আরাবুল ইসলামকে মেনে নিতে পারবেন না। তাঁদের দাবি, অন্তত ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রে আলাদা প্রার্থী দিক দল। যাতে এই দ্বৈত দায়বদ্ধতা এড়ানো যায়। যদিও জেলা নেতৃত্ব জানাচ্ছে বিষয়টি নিয়ে রাজ্য স্তরে আলোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। তবে সিপিএমের আপত্তি মানতে নারাজ আইএসএফ। জোটসঙ্গী আইএসএফের ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রের প্রার্থী আরাবুলকে নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছিল সিপিএম। কিন্তু ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির দল ওই আসনের প্রার্থী নিয়ে অনড়। সিপিএমের জেলা নেতৃত্ব ওই আসনে প্রার্থী দিতে চাপ দিলেও ধীরে চলো নীতি নিয়েছে আলিমুদ্দিন। এখনও পর্যন্ত ক্যানিং পূর্বের আরাবুলের সমর্থনে প্রচার বয়কটের পথেই হাঁটতে চলেছে সিপিএম। পাল্টা প্রার্থী সেখানে বামেদের তরফে দেওয়া হবে কি না তার সবুজ সংকেত আলিমুদ্দিনই জেবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সিপিএম প্রস্তুত প্রার্থী দেওয়ার জন্য।
আইএসএফকে তাদের প্রার্থী আরাবুলকে নিয়ে আপত্তির কথা আগেই জানিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। পাল্টা নওশাদ সিদ্দিকি বলেছিলেন আইএসএফ কাকে প্রার্থী করবে সেটা সম্পূর্ণ দলের বিষয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেই নওশাদ আলিমুদ্দিনে এসে বৈঠক করেছেন। আরাবুলকে জেলা পার্টি বয়কট করবে সেটা একপ্রকার নিশ্চিত। এই পরিস্থির মধ্যেই আবার বামেদের ঘোষিত এবং আরও কয়েকটি আসনে বিনা আলোচনায় প্রার্থী দিয়ে দিয়েছে নওশাদ সিদ্দিকির দল। ফলে জোট নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা। সিপিএম ও বামফ্রন্টের শরিকরা পাল্টা প্রার্থী আইএসএফের ঘোষিত কিছু আসনে দেবে। নন্দীগ্রামে সিপিআই, মধ্যমগ্রামে ফরওয়ার্ড ব্লক, বাসন্তী ও ভতরপুরে আরএসপি লড়বে। এখানে আইএসএফের প্রার্থীকে সমর্থন করবে না বামফ্রন্ট। বৃহত্তর জোটের কথা ভেবে আইএসএফের সঙ্গে আলোচনার জন্য সময় এখনও দিয়ে রেখেছে বামফ্রন্ট। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রে জয়ী হন সওকাত মোল্লা। তিনি সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী গাজি শাহাবুদ্দিন সিরাজিকে পরাজিত করে আসনটি ধরে রাখেন।
অন্যদিকে আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবনও কম বিতর্কিত নয়। কখনও কলেজ শিক্ষিকাকে জগ ছুড়ে মারার অভিযোগ, কখনও পুলিশ আধিকারিকের উপর হামলা। বিভিন্ন সময় নানা ঘটনায় তাঁর নাম সামনে এসেছে। ভাঙড় অঞ্চলে তাঁর প্রভাব ও কঠোর রাজনৈতিক স্টাইল নিয়ে বহু অভিযোগও রয়েছে। বাম শিবিরের অভিযোগ, তাঁর দাপটে একসময় অনেক সিপিএম নেতা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবুও আরাবুল ইসলাম নিজের অবস্থানে অনড়। তাঁর দাবি, তিনি সিপিএম নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সমর্থনের আশ্বাসও পেয়েছেন। তাঁর কথায় এই বিতর্ক আসলে রাজনৈতিক চক্রান্ত। বিরোধীদের ভয়ের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে তৃণমূল নেতা সওকত মোল্লা পাল্টা দাবি করেন, আরাবুলের পরাজয় নিশ্চিত জেনেই এইসব নাটক তৈরি করা হচ্ছে। ক্যানিং পূর্ব এখন যেন এক রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ। যেখানে অতীতের রেষারেষি। বর্তমানের জোট রাজনীতি আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক জটিল কাহিনী। এখানেই প্রশ্ন শুধু একজন প্রার্থীকে ঘিরে নয় বরং রাজনীতির সেই চিরন্তন দ্বিধাকে ঘিরে আর্দশ না কি সমীকরণ? শেষমেশ উত্তরটা হয়তো ভোটবাক্সই দেবে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত ক্যানিং পূর্বের হাওয়া যেন বারবারই মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজনীতি শক্র আর বন্ধুর সংজ্ঞা কখন যে বদলে যায় তা বোঝা সত্যিই কঠিন।