একটা মাইক্রোফোনের ঘোষণা। কয়েক মুহূর্তের আতঙ্ক। আর তার পরেই হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি, পদপিষ্ট হয়ে একের পর এক প্রাণহানি! উত্তর কলকাতার চোরবাগান দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গিয়েছে কান্না আর স্বজনহারানোর যন্ত্রণায়।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
কিন্তু এই বিপর্যয়ের পরেই উঠছে আরও একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। পুজোর মণ্ডপে ভিড় বাড়ানো, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের প্রতিযোগিতা, লাইভ ভিডিও কিংবা ব্লগারদের কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা এসব কি কখনও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে? মানুষের জীবন বাঁচাতে কি ব্লগারদের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা উচিত? প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার উত্তর দেওয়ার আগে জানতে হবে, চোরবাগানে ঠিক কী ঘটেছিল? ব্লগারদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তি কী? শনিবার ছিল দুর্গাপুজোর মহাসপ্তমী। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বহু মানুষ মণ্ডপের প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে আসেন। সেই সময়ই ভিড়ের চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তার পরেই পদপিষ্টের ঘটনা। মৃত্যু হয় ১৯ জনের। আহত হন আরও ২৫ জন। ঘটনার পর সামনে আসে মাইক্রোফোনে ঘোষণা ঘিরে বিতর্ক। মণ্ডপের কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে-এমন সতর্কবার্তা বা ঘোষণা দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীর অভাব এবং বিভ্রান্তিকর ঘোষণার বিষয় উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা গোটা ঘটনার ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বড় পুজো মানেই কেন বিপুল ভিড়ের প্রতিযোগিতা? কেন দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার চেয়ে কখনও কখনও প্রচার, জনপ্রিয়তা এবং ভিড়ের ছবি দেখানো বেশি গুরুত্ব পায়?

বর্তমানে কোনও বড় পুজো, নতুন থিমের মণ্ডপ কিংবা জনপ্রিয় প্রতিমা-সবকিছুর প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইউটিউব ব্লগার, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিও দেখে বহু মানুষ নির্দিষ্ট মণ্ডপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। একটি ভিডিও ভাইরাল হলে সেই মণ্ডপে দর্শনার্থীদের আগ্রহও বেড়ে যেতে পারে। লাইভ সম্প্রচার, ভিড়ের ছবি, দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রতিযোগিতা-সব মিলিয়ে উৎসবের প্রচারের ধরন বদলেছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন-কনটেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতায় যদি নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়, তাহলে তার দায় কে নেবে? কেউ যদি যাচাই না করে ঘোষণা করেন যে কোনও মণ্ডপ ভেঙে পড়তে চলেছে, কেউ যদি আতঙ্ক ছড়ানো তথ্য প্রচার করেন, অথবা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভিডিও করতে থাকেন, তাহলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
চোরবাগানের মতো মর্মান্তিক ঘটনার পর ক্ষোভ থেকে ব্লগারদের নিষিদ্ধ করার দাবি উঠতে পারে। মানুষের জীবন রক্ষার যুক্তিতে এই দাবি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হল, নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? ধরা যাক, কোনও ব্লগারের ভিডিও দেখে একটি মণ্ডপে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেল। সেই ভিড় সামলানোর দায়িত্ব কার? আয়োজক, পুলিশ, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কি কোনও ভূমিকা নেই?
আবার, কোনও ব্লগার যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ান, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মানুষকে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে উৎসাহিত করেন অথবা জরুরি পরিষেবার কাজে বাধা দেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠতেই পারে। ব্লগারদের অনেকেই পুজোর ইতিহাস, শিল্পকলা, সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জরুরি তথ্য, ট্র্যাফিকের পরিস্থিতি কিংবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কবার্তাও মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। তাই সমস্যাটা ব্লগিং নয়, সমস্যাটা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। সমস্যাটা ক্যামেরা নয়, সমস্যাটা এমন কনটেন্ট তৈরি করা যা মানুষের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে।
চোরবাগানের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে গেলে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বড় পুজোর মণ্ডপে কতজন মানুষ প্রবেশ করতে পারবেন, তার স্পষ্ট সীমা থাকা প্রয়োজন। প্রবেশ এবং বেরোনোর পথ আলাদা রাখা, জরুরি নির্গমনপথ খোলা রাখা এবং পর্যাপ্ত পুলিশ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কোনও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মাইক্রোফোনে ঘোষণা দেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। আতঙ্ক তৈরি না করে কীভাবে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যায়, তার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা দরকার। তৃতীয়ত, ব্লগার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও স্পষ্ট নিরাপত্তাবিধি তৈরি করা যেতে পারে। অনুমতি ছাড়া সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশ, জরুরি পরিষেবার কাজে বাধা, যাচাই না করা আতঙ্কজনক তথ্য প্রচার এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ভিড় বাড়ানোর মতো আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। চতুর্থ, প্রশাসন ও পুজো কমিটিগুলিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের প্রভাব মাথায় রেখে ভিড়ের সম্ভাব্য চাপের হিসাব করতে হবে। কোনও মণ্ডপে দর্শনার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে গেলে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু ব্লগারদের নিষিদ্ধ করার দাবি নয়, ভিড় নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে আয়োজকদের দায়িত্ব-প্রতিটি ক্ষেত্রেই জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। চোরবাগানের ১৯ মৃত্যু শুধু একটি পুজো মণ্ডপের দুর্ঘটনা নয়। এটি জনসমাগমের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং দায়িত্বশীল প্রচার নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মানুষের জীবন অবশ্যই সবকিছুর আগে। জনপ্রিয়তা, ভিউ, লাইকের সংখ্যা কিংবা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা-কোনও কিছুই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।