যুদ্ধের জের, উর্ধ্বমূখী হচ্ছে জিনিসের দাম ?

আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধের সরাসরি জের ভারতে। রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে পেট্রোল ডিজেল, দাম বাড়তে চলেছে একগুচ্ছ জিনিসের?

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ধসে গিয়েছে শেয়ার বাজার। এবার তেলের দামেও আগুন। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে হরমুজ প্রণালী। যার জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি কার্যত স্তব্ধ। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একধাক্কায় বাড়ল ৬ শতাংশ। সেক্ষেত্রে ভারতকেও আজ বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে পেট্রল-ডিজ়েলের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই মুহূর্তে অর্থাৎ ইরান ও আমেরিকা-ইজ়রায়েল যুদ্ধের আবহে হরমুজ় প্রণালী ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। যদিও ভারত জানিয়েছে, আপাতত পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে। তবুও ভারতের পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছে রাশিয়া। জানিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে কোনও সমস্যা হলে ভারতের চাহিদা পূরণ করতে রাশিয়া প্রস্তুত তেল সরবরাহ জারি রাখতে। আসলে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সারা বিশ্বে যায়। পারস্য উপসাগর হয়ে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে আরব সাগরে পড়ে ট্যাঙ্কারগুলি। তারপরে হয় এশিয়ার দিকে অথবা ইউরোপের দিকে ঘুরে যায়।
আমেরিকার এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে অন্তত ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বেরিয়েছে। এই পথ দিয়েই রপ্তানি হয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বের মোট জোগানের অন্তত ২০-৩০ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়। ইউরোপের বিমান জ্বালানির বড় অংশও এই পথ ধরে যায়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, আরব আমিরশাহি এবং ইরানেরও উত্তোলিত তেল ও গ্যাস রপ্তানি করতে এটাই একমাত্র জলপথ। সেখানেই এখন থমকে গিয়েছে সব। যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিয়েছে, দেশে ২৫ দিনের অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। ২৫ দিনের চাহিদা পূরণের মতো শোধিত জ্বালানিও রয়েছে। কিন্তু সংঘাত বেশি দিন চললে ভারতীয় বাণিজ্যে বড় প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল এলপিজি। ভারত তার মোট এলপিজি ব্যবহারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমদানি করে এবং এই সরবরাহের ৮৫-৯০% আসে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। অনুমান অনুসারে, সরবরাহ ব্যাহত হলে, বিদ্যমান মজুদ দুই সপ্তাহেরও কম সময় ধরে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে। পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায়, রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড এবং ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড নির্বাচিত পেট্রোকেমিক্যাল-সমন্বিত শোধনাগারগুলিতে এলপিজি উৎপাদন বৃদ্ধি শুরু করেছে। জিডিপির হিসাবে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি বিচার করলে ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তবুও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে প্রবল চাপে পড়তে পারে ভারত।ভারতের যা পেট্রোপণ্য লাগে তার ৮৫%-৮৮% মতো আমদানি করতে হয় এবার সেই আমদানির প্রায় ৫০% আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। অন্যদিকে ভারতের LNG আমদানির অন্তত ৫৪ শতাংশ আসে এই প্রণালী দিয়ে। বাকিটা রাশিয়া এবং অন্যান্য উৎস থেকে আসে। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে ভারতের নিত্যদিনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিতে টান পড়তে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের অর্থনীতিতে। তেলের আমদানিতে খরচ বাড়লে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে। দেশের মধ্যে তেলের দাম বাড়ালে মূল্যবৃদ্ধি বাড়লে। জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিক ভাবে উৎপাদনের খরচ বাড়বে। এর ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আমজনতা- সকলেই প্রবল চাপে পড়বে। তেলের দাম বাড়লে ধাক্কা লাগবে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিতেও। শুধু তো তেলই নয় এই যুদ্ধ বেশিদিন চললে কিন্তু ভারতের ওপর মারাত্মক প্রভাব আসতে চলেছে, একাধিক জিনিসের দাম বাড়তে চলেছে। আমেরিকা-ইরান সংঘর্ষ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে প্রভাব পড়তে পারে ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ধাক্কা খেতে পারে সার তৈরির প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানি। ডিএপি এবং এসএসপি সার তৈরির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সালফার এবং সালফিউরিক অ্যাসিড। মোট সালফার আমদানির প্রায় ৭৬ শতাংশই আসে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ওমান থেকে। দীর্ঘদিন হরমুজ বন্ধ থাকলে ধাক্কা খাবে সিএনজি এবং রান্নার গ্যাসের আমদানি। এক লাফে অনেকটা বৃদ্ধি পাবে দাম। দেশে তেল মজুত। সরকার আশ্বাস দিলেও চিন্তায় দেশবাসী। জ্বালানির দাম কতটা বাড়বে ? সেই চিন্তাতেই দিন কাটছে সাধারণ মানুষের. মাথায় রাখতে হবে ইতিমধ্যেই এক ধাক্কায় ৩১ টাকা দাম বাড়ল বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের।এবার থেকে ১৯ কেজির সিলিন্ডার পিছু দাম হবে ১৮৭৫ টাকা ৫০ পয়সা।আবার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ধাক্কায় পড়ল টাকার দাম! বুধবার সকালে লেনদেনের শুরুতে ৭০ পয়সা বেড়ে মার্কিন ডলারের দাম দাঁড়িয়েছে ৯২.১৭ টাকা। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, পতনে রেকর্ড করেছে ভারতীয় মুদ্রা। সাম্প্রতিক অতীতে এত নিচে নামেনি টাকার দাম। উল্লেখ্য, সোমবারও এক ডলারের মূল্য ছিল ৯১.৪৯ টাকা। যেহেতু কোনও তৈলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার করে আসছে না। ফলে, চাহিদা বাড়ছে তেলের। যেহেতু ভারতের আমদানিকৃত তেলের বেশিরভাগটাই আসে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েতের মতো দেশ থেকে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পর থেকে কমেছে রাশিয়ার থেকে তেল কেনা। সব মিলিয়ে চাপে রয়েছে ভারত। উল্লেখ্য, তেলের দাম বাড়লে অতিরিক্ত ডলার খরচ হয়। ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ে। এমন হলে দুর্বল হয়ে পড়ে ভারতীয় মুদ্রা।