জব কার্ড নিয়ে ধোঁয়াশায় আপনিও ?

যে কাজ সাধারণ মানুষের অধিকার, তা বছরের পর বছর বন্ধ ছিল কেন?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : তৃণমূল সরকারের আমল থেকে দীর্ঘদিন ধরে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ থাকায় সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের মাথায় কার্যত হাত পড়ে যায়। এবার নতুন সরকার ফের কাজ শুরু করাতে উচ্ছ্বসিত জব কার্ড হোল্ডাররা।রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় শুরু প্রক্রিয়া।

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা জব কার্ড সংক্রান্ত কাজ অবশেষে বুধবার থেকে পুনরায় শুরু হল হুগলি জেলার চারটি ব্লকে। চুঁচুড়া-মগরা, খানাকুল-১, গোঘাট-১ এবং গোঘাট-২ নম্বর ব্লকে এই প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তবে একইসঙ্গে উঠতে শুরু করেছে বড় প্রশ্ন—যে কাজ সাধারণ মানুষের অধিকার, তা বছরের পর বছর বন্ধ ছিল কেন?
জব কার্ড বছরের পর বছর বন্ধ থাকার মূল কারণ হলো কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী আধার কার্ড ও ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টের সাথে জব কার্ডের সংযুক্তিকরণ, দুর্নীতি রোধ করতে ভুয়ো কার্ড চিহ্নিতকরণ, এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজ্যে তহবিল স্থগিত থাকা।বহু শ্রমিকের জব কার্ডে নামের বানান, বয়স বা লিঙ্গের তথ্যে আধার কার্ডের সাথে অমিল ছিল, অথবা অনেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আধার ও NPCI বা National Payments Corporation of India লিঙ্ক করা ছিল না। এর ফলে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কার্ডগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।সরকার সারা দেশে ব্যাপক মাত্রায় ‘ভুয়ো’ এবং ‘ডুপ্লিকেট’ জব কার্ড চিহ্নিত করে তা বাতিলের অভিযান চালায়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি, ডুপ্লিকেট নাম, বা ভুয়া উপভোক্তাদের কার্ড সিস্টেম থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। রাজ্যে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় তিন বছর ধরে এই প্রকল্পের ফান্ড বা তহবিল পুরোপুরি বন্ধ রেখেছিল। পরবর্তীতে রাজ্য ও কেন্দ্রের আলোচনার মাধ্যমে ও হাইকোর্টের নির্দেশে প্রক্রিয়াটির সুরাহা হওয়ার চেষ্টা চলে। বহু পরিবার স্থায়ীভাবে গ্রাম পঞ্চায়েত ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বা শহরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়ায় জব কার্ড বাতিল করা হয়। অনেক সময় তালিকায় ‘Not Willing to Work’ বা ‘কাজে অনিচ্ছুক’ কারণ দেখিয়েও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

অনেকের কাছেই জব কার্ড বিষয়টি পরিস্কার নয়। তাদেরকে একটু বুঝিয়ে বলি। জব কার্ড হল কেন্দ্রীয় সরকারের মনরেগা প্রকল্প বা মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন।এই কার্ডটি থাকলে একটি পরিবার এক আর্থিক বছরে অন্তত ১০০ দিনের মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পায়।পরবর্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের মনরেগা প্রকল্পটি পরিবর্তন হয়ে “ভিবি-জি রাম জি” প্রকল্প হয়েছে, যা সাধারণত জিরামজি নামে পরিচিত।যার ফলে পুরানো জব কার্ড বাতিল বা অকার্যকর হবে না; বিদ্যমান যাচাইকৃত মনরেগা জব কার্ডটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন জিরামজি প্রকল্পের জন্য বৈধ হিসেবে রূপান্তর করা হবে।যেখানে কাজের নিশ্চয়তা ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে।যদি ১২৫ দিন কাজ দেওয়া না যায়, তবে আইন অনুযায়ী বেকারত্ব ভাতা প্রদানেরও ব্যবস্থা রয়েছে।আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘বিকশিত ভারত-বিকশিত ভারত- রোজগার ও আজীবিকা মিশন ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পে জব কার্ড হোল্ডারদের কাজ পেতে এই ‘ফেস অথেন্টিকেশন’ ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে নিজের মোবাইল সক্রিয় করার জন্য যেভাবে চেহারার প্রমাণ দিয়ে পরিচয় যাচাই করতে হয়। আর সেই কারণেই রাজ্যের জেলা জুড়ে জব কার্ড হোল্ডারদের ই-কেওয়াইসি চলছে।রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর সূত্রে খবর,আগে জব কার্ড হোল্ডার অর্থাৎ শ্রমিকদের উপস্থিতি ম্যানুয়ালি হত। ফলে জব কার্ড হোল্ডারের পরিবর্তে ওই নামে অন্য কেউ কাজ করে উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে যেত। কিন্তু এই ব্যবস্থাই উপভোক্তার মুখের ছবি তুলে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হলেই তবেই কাজের ছাড়পত্র মিলবে। এক কথায় এটি মূলত ‘আপনি আসলে আপনি কি না’ তা নিশ্চিত করার একটি ডিজিটাল উপায়।” যা পাসওয়ার্ড, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপের মতোই অত্যন্ত সুরক্ষিত পদ্ধতি। যা কোনোভাবেই জাল করা সম্ভব নয়।

বুধবার গোঘাট-১ নম্বর ব্লকের সাওরা গ্রাম পঞ্চায়েতের জোত মহব্বত বুথ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির সূচনা হয়। উপস্থিত ছিলেন গোঘাট-১ নম্বর ব্লকের বিডিও শান্ত চক্রবর্তী, জেপিও তারাপদ যশ-সহ একাধিক সরকারি আধিকারিক।গত কয়েক বছরে বহু শ্রমিক ও গ্রামীণ পরিবার জব কার্ড সংক্রান্ত কাজ বন্ধ থাকার কারণে চরম সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। নতুন জব কার্ড, সংশোধন, নাম অন্তর্ভুক্তি কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আটকে থাকায় বহু মানুষ সরকারি প্রকল্পের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ। ফলে আজ কাজ শুরু হলেও ,ক্ষোভের সুর পুরোপুরি চাপা পড়েনি।স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবে জব কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা দীর্ঘদিন অচল ছিল। তাই নতুন করে কাজ শুরু হওয়াকে তারা স্বাগত জানালেও জানতে চাইছেন, এতদিন কেন এই পরিষেবা বন্ধ ছিল এবং সেই ক্ষতির দায় কে নেবে? যদিও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ধাপে ধাপে জব কার্ড সংক্রান্ত সমস্ত পরিষেবা স্বাভাবিক করা হবে।

জবকার্ডের কর্মসূচি ঘিরে কাজ প্রত্যাশীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে বুথে হাজির হন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রামবাসীদের দাবি, শুধু উদ্বোধন বা ঘোষণা নয়, নিয়মিত ও স্বচ্ছ পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জব কার্ড সংক্রান্ত কাজ পুনরায় চালু হওয়ায় আপাতত স্বস্তি ফিরেছে গ্রামীণ এলাকায়। অবৈধ জবকার্ড গ্রাহকদের চিহ্নিত করার লক্ষে কয়েক বছর এই পরিষেবা বন্ধ থাকায় আস্থা হারাচ্ছিল প্রান্তিক মানুষ।। কারণ গ্রাম বাংলার হাজার হাজার পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে জব কার্ড শুধুমাত্র একটি কার্ড নয়, তা জীবিকা ও অধিকারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।সেই কাজ শুরু হতে আশার আলো দেখছেন এঁরা।