আপনার পকেটেও জাল কয়েন?

আপনার পকেটে থাকা ২০ টাকার কয়েনটাই কি জাল? যে কয়েন দিয়ে নিশ্চিন্তে বাজার করছেন, বাসভাড়া দিচ্ছেন, টোলের টাকা মেটাচ্ছেন, সেই কয়েনই হয়তো তৈরি হয়েছে কোনও গোপন কারখানায়! সরকারি টাঁকশাল নয়, অপরাধীদের নিজস্ব টাঁকশাল! আর সেখান থেকেই দেশের একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে জাল ২০ টাকার কয়েনের বিশাল নেটওয়ার্ক! পুলিশের তদন্তে উঠে আসছে ৭০ কোটি টাকারও বেশি জাল মুদ্রা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার বিস্ফোরক দাবি! কিন্তু কারা চালাচ্ছে এই সাম্রাজ্য? কীভাবে আসল মুদ্রার আদলে তৈরি হচ্ছে নকল কয়েন? আর আপনার পকেটে পৌঁছে যাচ্ছে না তো সেই জাল মুদ্রাই?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে পুলিশের অভিযানে সামনে এল এমনই এক চাঞ্চল্যকর জাল মুদ্রা চক্র। হরিয়ানার সোনিপতে স্ক্রু-ড্রাইভার তৈরির কারখানার আড়ালে চলছিল জাল ২০ টাকার কয়েন তৈরির কারবার। তৈরি থেকে সরবরাহ—প্রতিটি ধাপের জন্য ছিল আলাদা ব্যবস্থা। আর এই নেটওয়ার্কের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছিল দিল্লি, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত! প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের পকেটে থাকা কয়েনের মধ্যেই কি লুকিয়ে রয়েছে এই জালিয়াতির ছাপ?

ঘটনার সূত্রপাত সাহারানপুরে। পুলিশের কাছে খবর আসে, প্রায় ৫০০ বর্গফুটের একটি জায়গা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সেখানে বসানো হবে ছয়টি ভারী যন্ত্র। বাইরে থেকে উদ্দেশ্য, সরঞ্জাম তৈরি। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ হয়, এই যন্ত্রপাতির আড়ালে অন্য কোনও কারবারের প্রস্তুতি চলছে। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর টিটরন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। পাঁচজনকে আটক করা হয়। তাঁদের গাড়িতে তল্লাশি চালাতেই উদ্ধার হয় ভারী যন্ত্রপাতি। আর সেই সূত্র ধরেই সামনে আসে জাল ২০ টাকার কয়েন তৈরির অভিযোগ।

উদ্ধার হয় ৬ হাজার ৪০০টি কয়েন। যার মূল্য ১ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা। শুধু তাই নয়, উদ্ধার হয় আরও প্রায় ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের অর্ধেক তৈরি কয়েন। অর্থাৎ, কয়েন তৈরি হয়ে বাজারে পৌঁছনোর আগেই পুলিশের অভিযানে ভেস্তে যায় কারবারের একটি বড় অংশ।

কিন্তু সাহারানপুরে এই কারখানা কি নতুন করে তৈরি হয়েছিল? তদন্তে উঠে আসে আরও বড় তথ্য। এর আগে হরিয়ানার সোনিপতে প্রায় দশ মাস ধরে চলছিল এই জাল কয়েন তৈরির ইউনিট। বাইরে স্ক্রু-ড্রাইভার তৈরির ব্যবসার পরিচয়। ভিতরে চলছিল সম্পূর্ণ অন্য কারবার! কিন্তু হঠাৎ সোনিপতের কারখানা সরানোর প্রয়োজন পড়ল কেন? পুলিশের দাবি, এই চক্রের এক সহযোগী দিল্লি পুলিশের হাতে ধরা পড়তেই বিপদ আঁচ করেন বাকিরা। তদন্তের আঁচ যাতে কারখানায় না পৌঁছয়, সেই আশঙ্কায় যন্ত্রপাতি সরিয়ে উত্তরপ্রদেশে নতুন ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা হয়। কিন্তু গোপনে ঘাঁটি বদলের সেই চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত পুলিশের নজরে চলে আসে।

এই চক্রের অন্যতম অভিযুক্ত ৬২ বছরের উপকার লুথরা ওরফে অভয় প্রতাপ সিংহ। পুলিশের দাবি, এর আগেও জাল কয়েন তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। একসময় স্বর্ণকারের কাজ করতেন উপকার। তদন্তকারীদের অনুমান, ধাতু নিয়ে কাজের সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়েছিলেন জাল মুদ্রা তৈরিতে। তদন্তে উঠে এসেছে হিমাংশু নামে আর এক অভিযুক্তের নাম। পুলিশের দাবি, তিহাড় জেলে উপকারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর। সেখান থেকেই তৈরি হয় যোগাযোগ। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজনকে নিয়ে এই কারবার চালানোর অভিযোগ ওঠে।

কিন্তু কীভাবে তৈরি হচ্ছিল জাল ২০ টাকার কয়েন? পুলিশের দাবি, প্রথমে দিল্লির একটি ইউনিট থেকে সংগ্রহ করা হত কয়েনের আকারের ধাতব রিং। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও নিকেলের মিশ্রণে তৈরি সেই রিংয়ের উপর বিশেষ ছাঁচ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হত নকশা। এরপর পালিশ ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় দেওয়া হত আসল কয়েনের মতো চেহারা।

পুলিশ উদ্ধার করেছে ৩৯টি চিহ্নহীন এবং ২০টি চিহ্নিত ছাঁচ। সঙ্গে গ্রাইন্ডিং স্টোন, ব্রাশ, ফাইল, হাতুড়ি, করাত-সহ একাধিক সরঞ্জাম। তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্তরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার কয়েন তৈরির ক্ষমতার কথা জানিয়েছেন। প্রতিটি কয়েন তৈরিতে খরচ পড়ত মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকা। অর্থাৎ, সামান্য উৎপাদন খরচে তৈরি হচ্ছিল ২০ টাকার অভিহিত মূল্যের নকল মুদ্রা! কিন্তু শুধু কয়েন তৈরি করলেই তো হবে না, সেগুলি বাজারে চালাতে হবে। আর এখানেই ছিল চক্রের আসল কৌশল।

পুলিশের দাবি, ১০০টি কয়েনের একটি প্যাকেট, যার মূল্য ২০০ টাকা, মধ্যস্থতাকারীদের কাছে বিক্রি করা হত মাত্র ১৬০ টাকায়। অর্থাৎ, ২০০ টাকার কয়েন পেতে দিতে হত ১৬০ টাকা! এই ছাড়ের প্রলোভনেই তৈরি হয়েছিল সরবরাহের নেটওয়ার্ক। অভিযোগ, তরুণদেরও কাজে লাগানো হত কয়েন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। তাঁদের অনেকেই নাকি জানতেন না, হাতে থাকা কয়েনগুলি জাল। সেই কয়েন পৌঁছে যেত টোল প্লাজা, মদের দোকান, ছোট বাজার এবং গ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে। বড় লেনদেনের বদলে ছড়িয়ে দেওয়া হত ছোট ছোট অঙ্কে। ফলে কারখানার সঙ্গে বাজারের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া হয়ে উঠত আরও কঠিন।

আর এই সরবরাহ চক্রেরই একটি সূত্র মেলে দিল্লিতে। সেপ্টেম্বর মাসে মুন্ডকা শিল্পাঞ্চল মেট্রো স্টেশনের কাছে পারস জৈন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। তাঁর গাড়ি থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ১ লক্ষ টাকা অভিহিত মূল্যের জাল ২০ টাকার কয়েন। পুলিশের দাবি, উপকার লুথরার কাছ থেকেই ওই কয়েন সংগ্রহ করেছিলেন পারস। এক লক্ষ টাকার কয়েনের জন্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই গ্রেফতারি এবং জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা পৌঁছন সোনিপতের সেই কারখানার দিকে। এরপরই সাহারানপুরে যন্ত্রপাতি সরানোর তৎপরতা শুরু হয় বলে পুলিশের দাবি।

তদন্ত এখানেই থেমে থাকেনি। বিহারের মধুবনীতে অভিযান চালিয়ে মিথিলেশ চৌরাসিয়া নামে আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে সাহারানপুর পুলিশ। তদন্তকারীদের অভিযোগ, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং শ্রমিকের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। সাহারানপুরের মামলায় ধৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়। দিল্লিতে ধৃত পারস জৈনের ভূমিকা নিয়েও চলছে তদন্ত।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি, অভিযুক্তরা নাকি ইতিমধ্যেই ৭০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জাল কয়েন বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। যদিও এই অঙ্কের সত্যতা এখনও যাচাই করা হয়নি। ঠিক কত কয়েন তৈরি হয়েছে, কতগুলি বাজারে পৌঁছেছে, আর কতগুলি এখনও উদ্ধার করা বাকি—সেই হিসাবই এখন তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তবে এই ধরনের জাল কয়েন তৈরির অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৬ সালে দিল্লি ও হরিয়ানায় তিনটি জাল কয়েন তৈরির ইউনিটের হদিশ পেয়েছিল পুলিশ। উদ্ধার হয়েছিল ১২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা অভিহিত মূল্যের জাল কয়েন। সেই মামলাতেও উপকার লুথরার নাম উঠে এসেছিল বলে সংবাদে উল্লেখ রয়েছে। ২০১৯ সালে হরিয়ানার বাহাদুরগড়েও অন্য ব্যবসার আড়ালে জাল কয়েন তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছিল। অর্থাৎ, প্রশ্নটা শুধু একটি কারখানা বা কয়েকজন অভিযুক্তকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন, এতদিন ধরে কীভাবে তৈরি হচ্ছিল এই নেটওয়ার্ক? কোথায় কোথায় পৌঁছে গিয়েছে জাল কয়েন? আর সাধারণ মানুষের হাতে থাকা মুদ্রার মধ্যে কতগুলি এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার কোনও নির্ভরযোগ্য হিসাব কি রয়েছে? কারণ, ২০ টাকার একটি জাল কয়েনের ক্ষতি হয়তো একজনের কাছে সামান্য। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের হাতে সেই কয়েন পৌঁছে গেলে ক্ষতির অঙ্ক বদলে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন ছোট দোকানদার, ব্যবসায়ী, পরিবহণকর্মী—যাঁরা প্রতিদিনের লেনদেনে মুদ্রার সত্যতা যাচাই করার সুযোগই পান না।

তাই সাহারানপুরের এই অভিযান নিছক জাল কয়েন উদ্ধারের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের মুদ্রাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এবং অপরাধের এক সুসংগঠিত সরবরাহ চক্র। এখন দেখার, পুলিশের তদন্তে এই জালিয়াতির জাল কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং বাজারে ছড়িয়ে থাকা জাল মুদ্রার প্রকৃত পরিমাণ শেষ পর্যন্ত কত দাঁড়ায়। আপনার পকেটে থাকা ২০ টাকার কয়েনটির মূল্য হয়তো কেবল ২০ টাকা। কিন্তু সেটি আসল না জাল—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে গোটা দেশের সামনে!