প্রয়াত শিল্পী যোগেন চৌধুরী, ক্যানসারের কাছে হার মানলেন

দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে অবশেষে হার মানলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ভারতীয় শিল্পকলার এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসার সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল না। তাঁর প্রয়াণে শিল্পজগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিজের অনন্য শিল্পশৈলী ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে যে স্বতন্ত্র পরিচয় তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর চলে যাওয়া ভারতীয় চিত্রকলার জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

নীরব হয়ে গেল শিল্পীর তুলির ছন্দ, থেমে গেল ক্যানভাসে রঙের সেই অনন্য ভাষা। দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ যোগেন চৌধুরী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। জানা গিয়েছে, অসুস্থতার মধ্যেও তাঁকে সুস্থ করে তুলতে একাধিকবার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। টানা ন’টি সাইকেলে চলেছিল চিকিৎসা। কিন্তু বয়সজনিত নানা জটিলতার কারণে রোগের সঙ্গে লড়াই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। চিকিৎসকদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় কিছুটা সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। মহাষষ্ঠীর দিন গুরুতর মূত্রনালির সংক্রমণ এবং সেপসিসের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে পড়লে ভেন্টিলেশনে রাখা হয় শিল্পীকে। তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য চিকিৎসকেরা সবরকম চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত আর তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

রবিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে আসে সেই দুঃসংবাদ। চিরবিদায় নিলেন ভারতীয় চিত্রকলার জগতের এক বিশিষ্ট শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি শিল্পীজীবনের অবসান হল না, ভারতীয় শিল্পকলার পরিসরেও তৈরি হল এক অপূরণীয় শূন্যতা। তাঁর সৃষ্টি, শিল্পভাবনা এবং ক্যানভাসে ফুটে ওঠা নিজস্ব অভিব্যক্তি আগামী দিনেও শিল্পপ্রেমীদের মনে বেঁচে থাকবে।

শিল্পচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই নিজের কর্মজীবনের সূচনা করেছিলেন যোগেন চৌধুরী। ১৯৬০ সালে কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর হাওড়ার একটি স্কুলে শিল্পের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এর দু’বছর পর, ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনারের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীকালে মাদ্রাজেও বস্ত্রশিল্পের নকশা তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন এই শিল্পী।তাঁর শিল্পীজীবনে নতুন দিগন্ত খুলে যায় ১৯৬৫ সালে। ফরাসি সরকারের বৃত্তি পেয়ে শিল্পকলার উচ্চতর শিক্ষা নিতে প্যারিসে পাড়ি দেন তিনি।

বিদেশে শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকে আরও সমৃদ্ধ করে। দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব সামলান দক্ষতার সঙ্গে। পাশাপাশি শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনা করে বহুদিন ধরে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখিয়েছেন তিনি।শুধু শিল্পের পরিসরেই নয়, রাজনীতির মঞ্চেও নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন যোগেন চৌধুরী। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। শিল্প ও রাজনীতির এই দুই ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজ ও রাজনীতির নানা অসংগতি এবং বাস্তবতাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা। বিষয় নির্বাচনের অভিনবত্বের পাশাপাশি কালি ও তুলির অসাধারণ প্রয়োগ তাঁর শিল্পকর্মকে দিয়েছিল স্বতন্ত্র পরিচয়। ভারতীয় শিল্পকলার ঐতিহ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পভাবনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব এক শিল্পভাষা। সেই স্বকীয়তা তাঁকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন “গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ওঁর অনেক সৃষ্টি অক্ষয়, অমর হয়ে রয়েছে। বিরাট বড় মাপের শিল্পী।” শিল্পী যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শোক প্রকাশ করেছেন।একাধিক ইস্যুতে রাজপথে তো আবার কখনও প্রতিবাদ মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা গিয়েছে শিল্পীকে। তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদও করেছিলেন মমতা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে লিখেছেন