শুভেন্দুর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শিল্পীরা

ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি জগতের কিছু পরিচিত মুখ- সমীর আইচ, অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তী-সহ একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ২০১১ সালে কলকাতার রাজভবনে যখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি জগতের বহু পরিচিত মুখ। পরিবর্তনের সেই আবহে শিল্পী-সাহিত্যিকদের একটা বড় অংশ প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন নতুন সরকারকে। টলিউড তারকা থেকে নাট্যব্যক্তিত্ব- অনেকেই সেদিন বলেছিলেন, বাংলায় নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হবে, গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।

আর ঠিক ১৫ বছর পর, ২০২৬ সালে আবার বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে পালাবদল। এ বার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। আর সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে ফের দেখা গেল সংস্কৃতি জগতের কিছু পরিচিত মুখকে। উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী সমীর আইচ, অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তী-সহ একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁরা নতুন সরকারের কাছে আশা প্রকাশ করেছেন- বাংলায় শিল্প, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং কর্মসংস্থানের পরিবেশ আরও উন্নত হবে। অন্যদিকে, রাজ্যের সদ্য বিদায়ী তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভও উগরে দিয়েছেন শিল্পী। বিশেষ করে দুর্নীতি, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরব হয়েছেন শিল্পী সমীর আইচ। ২০১১ আর ২০২৬-এর রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে কী মিল, কী অমিল, আর কেন ফের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় শিল্পী সমাজের একটা অংশ নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আশার কথা বলছেন?

৯ মে, শনিবার ব্রিগেডের সকালটা ছিল একেবারেই আলাদা। সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। বিজেপির পতাকা, ঢাক-ঢোল, ছৌ নাচ, রবীন্দ্র সঙ্গীত আবহ সব মিলিয়ে যেন রাজনৈতিক সমাবেশের পাশাপাশি একটা বাঙালীয়ানা উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ দেশের একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ জোটের নেতারা।

ব্রিগেডের বিশাল মঞ্চে শুভেন্দু অধিকারী যখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, তখন দর্শকাসনের একাংশে দেখা যায় শিল্পী সমীর আইচ এবং অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তী সহ আরও বিশিষ্ট্য অতিথীদের। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তাঁরা নতুন সরকারের প্রতি আশা ব্যক্ত করেন। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী সমীর আইচ বলেন, বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে যে ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে একটা মুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। তাঁর কথায়, “শিল্পের স্বাধীনতা থাকতে হবে। শিল্পীকে রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাগ করা ঠিক নয়। নতুন সরকার সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দেবে বলেই আশা করছি।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত কয়েক বছরে রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ মানুষের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ তৈরি করেছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, পুরসভা নিয়োগ কেলেঙ্কারি, রেশন দুর্নীতি- একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সমীর আইচ বলেন, “মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও চেয়েছে।”

অন্যদিকে অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তীও বলেন, বাংলার সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চাকে নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলা সংস্কৃতি কখনও কোনও একটি দলের সম্পত্তি হতে পারে না। শিল্পীদের স্বাধীন পরিবেশ দরকার। নতুন সরকার সেই জায়গাটা বুঝবে বলেই আশা করছি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার রাজনীতিতে শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালে যেমন পরিবর্তনের হাওয়ায় বহু শিল্পী প্রকাশ্যে তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তেমনই ২০২৬ সালে আবার একটা অংশ নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। তবে এ বার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। কারণ গত কয়েক বছরে রাজ্যে দুর্নীতি ইস্যু বড় রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছিল। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ- বিরোধীরা লাগাতার তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই ক্ষোভের একটা প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোটের ফলেও। আর সেই কারণেই নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও “পরিবর্তনের প্রত্যাশা” কথাটা বারবার উঠে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস যেন আবারও এক পূর্ণবৃত্ত সম্পূর্ণ করল।
২০১১ সালে “পরিবর্তন” শব্দটা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের প্রতীক। আর ২০২৬ সালে সেই একই শব্দ ফের ফিরে এল অন্য এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে— এ বার শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে।

তবে রাজনীতির এই পালাবদলের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বারবার সামনে এসেছে- শিল্পী সমাজের অবস্থান। কারণ বাংলার সংস্কৃতি ও রাজনীতি বরাবরই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। যে বাংলায় কবিতা, নাটক, গান, সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, বরং রাজনৈতিক চেতনারও অংশ- সেখানে সরকার বদলের সময় শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতিক্রিয়া সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০১১ সালে শিল্পী সমাজের একটা বড় অংশ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। তারা মনে করেছিল নতুন সরকার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার নতুন দরজা খুলবে। আর ২০২৬ সালে ফের একদল শিল্পী নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে একই রকম প্রত্যাশার কথা বলছেন। তবে এ বার সেই প্রত্যাশার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে একটা বড় শব্দ- “স্বচ্ছতা”। তবে আপাতত ব্রিগেডের এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের মুহূর্ত নয়- এটা বাংলার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মানসিকতারও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ২০১১ সালে যেমন মানুষ “পরিবর্তন” শব্দটাকে আশা হিসেবে দেখেছিল, ২০২৬ সালেও আবার সেই আশার কথাই শোনা যাচ্ছে। এখন দেখার- এই নতুন পরিবর্তন বাংলার রাজনীতি, প্রশাসন এবং সংস্কৃতির মানচিত্রে ঠিক কতটা স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে।