“বাঘের মাটিতে গর্জন”—সুন্দরবনে ভোটমঞ্চে অশ্বিনী-মানিকের হুঙ্কার, ডবল ইঞ্জিনে উন্নয়নের বার্তা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল এবার নির্বাচনী উত্তাপে তপ্ত। সেই আবহেই ভোট প্রচারে এসে তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ করলেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা। কুলতলি বিধানসভা কেন্দ্রের সভা থেকে তাঁরা সরাসরি বার্তা দিলেন—এই নির্বাচনে পরিবর্তন অনিবার্য, আর তার জন্য দরকার “ডবল ইঞ্জিন সরকার”।
সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, “এটা সুন্দরবন, বাঘের এলাকা। এখানে বাঘের মতোই গর্জন দরকার। মানুষ এবার ভয় পাবে না, তারা নিজেদের অধিকার বুঝে ভোট দেবে।” তাঁর এই মন্তব্যে সভাস্থলে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তিনি দাবি করেন, প্রথম দফার ভোটেই রাজ্যে ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা প্রমাণ করে মানুষ পরিবর্তন চাইছে। তাঁর কথায়, “এই ভোট শতাংশই দেখিয়ে দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সময় শেষ হয়ে এসেছে।”
রেলমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলার ঐতিহ্যের প্রসঙ্গও টানেন। তিনি বলেন, “নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর এই বাংলায় আজ সিন্ডিকেট ও কাটমানির রাজত্ব চলছে। এই অবস্থা আর চলতে পারে না।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আগামী চার তারিখের পর এই সরকার আর থাকবে না, জনগণই তার জবাব দেবে।
কুলতলি কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী মাধবী মহলদার-এর সমর্থনে প্রচারে এসে তাঁকে “সাধারণ ঘরের মেয়ে” বলে তুলে ধরেন বৈষ্ণব। তিনি বলেন, “মাধবী আমার কাছে এসে সুন্দরবনের উন্নয়নের কথা বলেছে। আপনাদের এই মেয়েকে জেতাতে হবে, তাহলেই উন্নয়ন সম্ভব।” প্রার্থীকে সামনে রেখে তিনি উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি খুলে দেন।
বিশেষ করে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। তিনি জানান, লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত ডবল লাইন তৈরি করা হবে, যাতে যাতায়াত আরও সহজ ও দ্রুত হয়। এছাড়া জয় নগরের দক্ষিণ বারাসাত থেকে ঢাকি হয়ে রায়দিঘী পর্যন্ত নতুন রেললাইন তৈরির পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি। সুন্দরবন অঞ্চলে মোট তিনটি নতুন রেললাইন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বারুইপুর থেকে মৈপিঠ পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্পের জন্য ভোট মিটলেই সার্ভের কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি ক্যানিং রেল স্টেশন-কে আধুনিক রূপে সাজানোর কথাও ঘোষণা করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন এবং এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, “১৪ হাজার কোটি টাকার রেল প্রকল্প আমরা পরিকল্পনা করেছি। এই কাজগুলো বাস্তবায়িত করতে হলে রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার দরকার। কেন্দ্র একা উন্নয়ন করতে পারবে না, রাজ্যের সহযোগিতা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “কলকাতা মেট্রো-র কাজ কেউ থামাতে পারবে না। উন্নয়নকে আটকানোর চেষ্টা করছে তৃণমূল, কিন্তু মানুষ এবার তার জবাব দেবে।”
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহাও এই সভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া দেশের অন্য কোনও রাজ্যে এত ঘোটালা নেই। এখানে দুর্নীতি একটা প্রথা হয়ে গেছে। মানুষ এর থেকে মুক্তি চায়।” তিনি দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে স্বচ্ছ প্রশাসন এবং উন্নয়ন দুটোই নিশ্চিত করা হবে।
সভা থেকে মহিলাদের জন্য বিশেষ প্রতিশ্রুতিও দেন বিজেপি নেতারা। তাঁরা বলেন, “মাতৃশক্তিকে সম্মান জানাতে প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।” মধ্যপ্রদেশ ও বিহারের উদাহরণ টেনে তাঁরা জানান, অন্য রাজ্যে এই ধরনের প্রকল্প সফল হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও তা চালু করা হবে।
পুরো সভা জুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে “উন্নয়ন বিরোধী” বলেই আক্রমণ শানানো হয়। বিজেপি নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, তারা এই নির্বাচনে উন্নয়ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ শাসনের বিষয়টিকেই বড় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলের মতে, সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে রেল যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিজেপির এই প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করবে, সেটাই এখন দেখার।
সব মিলিয়ে, সুন্দরবনের কুলতলি কেন্দ্রের এই সভা থেকে বিজেপি যে জোরালো বার্তা দিতে চেয়েছে, তা স্পষ্ট—পরিবর্তনের ডাক, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ। এখন ভোটের বাক্সই ঠিক করবে, সুন্দরবনের মানুষ কাদের ওপর আস্থা রাখছে।