সরকারের মূল লক্ষ্য নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা বিদেশ থেকে নিট অভিবাসনের সংখ্যা কমানো।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : এবার ট্রাম্পের মত কঠোর অভিবাসন নীতির পথে হাঁটতে চলেছে অস্ট্রেলিয়াও। কেন ? তালিকায় রয়েছে কোন কেন দেশের নাম ? কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি?
অস্ট্রেলিয়ার আলবানিজি নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও ভিজিটর ভিসা ব্যবস্থায় আরও কঠোর নিয়ম আরোপের বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা বিদেশ থেকে নিট অভিবাসনের সংখ্যা কমানো এবং এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় গিয়ে দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে বলার আগে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপনাদের সামন ছোট করে তুলে ধরব।
অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজির দল লেবার পার্টি এবং ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘ওয়ান নেশন’ এর মধ্যকার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ২০২৬ সালে অত্যন্ত তীব্র রূপ নিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন বিতর্কের জেরে পলিং বা জনমতের নিরিখে পলাইন হ্যানসনের নেতৃত্বাধীন ওয়ান নেশন দলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আলবানিজি সরকার ওয়ান নেশনকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করতে শুরু করেছে। বিষয়টি নজরে আসে এই বছরের জুলাই মাসে। অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত লেবার পার্টির ন্যাশনাল কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজি প্রধান বিরোধী দল লিবারেল-ন্যাশনাল কোয়ালিশনকে ছাপিয়ে সরাসরি ওয়ান নেশন পার্টিকে লক্ষ্য করে কড়া বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, ওয়ান নেশন শ্রমিকদের মজুরি কমাতে চায় এবং স্বাস্থ্যখাতে বাজেট কমাতে চায়।

এবার আসা যাক অভিবাসন ও শরণার্থী নীতির কথায়।অস্ট্রেলিয়ায় আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ওয়ান নেশন দল দেশের অভিবাসন নীতিকে দায়ী করে তা কঠোরভাবে কমানোর দাবি তুলছে। ওয়ান নেশনের এই রাজনৈতিক চাপের কারণে আলবানিজি সরকারের ওপর অভিবাসী কমানোর বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সম্প্রতি আলবানিজি স্পষ্ট করেছেন যে অস্ট্রেলিয়ার মানবিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে বার্ষিক ২০,০০০ শরণার্থীর কোটা কমানো হবে না। আলবানিজি ওয়ান নেশনের রাজনীতিকে “অ্যাক্সিস অফ গ্রিভেন্স” বা মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার রাজনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ওয়ান নেশন সাধারণ মানুষের কথা বললেও মূলত তারা বিলিয়নেয়ারদের স্বার্থ রক্ষা করে।তবে আচমকাই ওয়ান নেশন জনমত সমীক্ষায় দেশের প্রধান দলগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। ২০২৫ সালে ফেডারল নিরবাচনে এই দল মাত্র সাড় ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে ডেমোসএইউ সমীক্ষায় দেখা যায় তাদের সমর্থন বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছে গেছে।ক্ষমতাসীন লেবারপার্টির ২৬ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে।বিরোধী জোট কোয়ালিশনকে পিছনেফেলে দিয়েছে অনেক আগেই।আর চমকানের মত বিষয় হল, অভিবাসন প্রশ্নে ভোটাররা এখন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ ও বিরোধী নেতা ও বিরোধী নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর -এই দুজনের থেকে হ্যানসনকেই বেশি বিশ্বাস করেন।
এবার আসা যাক শিক্ষার্থীদের ভিসার ক্ষেত্রে কি ভাবা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার তরফে।অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে অবস্থান করে নতুন করে Student Visa আবেদন করার সুযোগ আরও সীমিত করার পরিকল্পনা করছে সরকার।বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে নিম্নস্তরের ভোকেশনাল বা অন্য কোর্সে ভর্তি হয়ে নতুন স্টুডেন্ট ভিসা ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।সরকার এমন “visa hopping” বন্ধ করতে চায়, যেখানে একজন ব্যক্তি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অস্থায়ী ভিসায় দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেন।রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আসা পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন সীমাবদ্ধতা আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।তবে পোস্টগ্র্যাজুয়েট গবেষণা শিক্ষার্থী এবং সরকারি স্কলারশিপপ্রাপ্ত কিছু শিক্ষার্থীর পরিবারের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হতে পারে।নতুন পরিকল্পনায় কিছু শ্রেণির Visitor Visa-এর মেয়াদ ১২ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করার প্রস্তাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, এই পরিবর্তন নভেম্বর থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত নিয়ম এবং কোন কোন ভিসা ক্যাটাগরি এর আওতায় পড়বে, তা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।লেবার সরকারের পরিকল্পনার আরেকটি অংশ হলো অস্ট্রেলিয়ায় ভিজিটর হিসেবে এসে পরে অন্য ধরনের ভিসার আবেদন করে দীর্ঘ সময় অবস্থানের সুযোগ কমানো।এর আগে ABC জানিয়েছিল, সরকার ভিজিটর ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসে কিছু পারিবারিক ভিসার জন্য অনশোর আবেদন করার সুযোগ সীমিত করার পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে।
প্রশ্ন হল কেনও এত কড়াকড়ি।অস্ট্রেলিয়ার পোস্ট-কোভিড সময়ে নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২২–২৩ অর্থবছরে এটি প্রায় ৫৩৮,৩৪০-এ পৌঁছেছিল।লেবার সরকার ২০২৭–২৮ অর্থবছরের মধ্যে নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন প্রায় ২২৫,০০০-এ নামিয়ে আনার পূর্বাভাস দিয়েছে। এজন্য অস্থায়ী ভিসায় দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান কমানোকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।অন্যদিকে সরকার ইতোমধ্যে Skilled Visa প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে অবস্থানরত কিছু দক্ষ কর্মীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, AUKUS-সংশ্লিষ্ট কাজ, নির্মাণ, স্বাস্থ্য এবং বয়স্কসেবা খাতে কর্মরত আবেদনকারীরা দ্রুততর প্রসেসিং সুবিধা পেতে পারেন। সরকারের যুক্তি হলো, ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা দক্ষ কর্মীদের স্থায়ী ভিসায় নেওয়া হলে নতুন করে বিদেশ থেকে লোক আসার প্রয়োজন কিছুটা কমবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতি সংস্কার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় অভিবাসী ও শিক্ষার্থীরা একটি বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের রেকর্ড-উচ্চ নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের সংখ্যা কমিয়ে আনতে যখন একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।তখন অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয়রা একক বৃহত্তম অভিবাসী জনগোষ্ঠী হওয়ায় এই নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তাদের ওপর।