জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগ? এটাই ছিল এতদিন পর্যন্ত সব থেকে প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশ তো বটেই, উত্তর খুঁজছিল গোটা বিশ্ব। অবশেষে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল। বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না আওয়ামী লীগ। স্পষ্ট ভাযায় জানিয়ে দিল বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ.এম.এম নাসিরউদ্দিন জানান, এই সিদ্ধান্ত সরকারের নয়। নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও জানান, আইনগতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বাংলাদেশে। স্থগিত দল হওয়া মানে তাদের যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত। তাই আগামী নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তাছাড়া তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কোনও ভাবেই আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। কারণ তাদের বিচার চলছে। সেই বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনভাবেই নির্বাচনে লড়াই করতে পারবে না। এটি আইনবিরুদ্ধ।

নির্বাচন কমিশন কি বলেছে সেটা বললাম আপনাদের। বাংলাদেশে বর্তমানে কী পরিস্থিতি সেটা আপনারা প্রত্যেকেই জানেন। ইউনুসের সঙ্গে সেনার সম্পর্ক যে খুব ভালো নয়, সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি কার্যকলাপে সেটা স্পষ্ট। বিএনপি-র তরফেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে ইউনুসকে। বলা হচ্ছে সেনার সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে, সরাসরি আগুন নিয়ে খেলা করছেন ইউনুস। যেটা রাষ্ট্রের স্বাস্থের পক্ষে ভালো নয়। অন্যদিকে বিএনপি চাইছে যেন-তেনো প্রকারে সেনার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে। কারণ এটাই তো বিএনপি-র কাছে সুবর্ন সুযোগ ফের ঢাকার মসনদে বসার। সেই সুযোগ কোনও ভাবে হাতছাড়া করতে চায় না খালেদা জিয়ার দল। খালেদার দলের কিন্তু আরও একটা ভয় রয়েছে। কী বলুন তো। আরে ইউনুস রাষ্ট্রসংঘে তাঁর সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। আর তাদের অনেক সমর্থকও রয়েছে বাংলাদেশে। ফলে ভয় তো একটা থাকবেই বিএনপি-র। কারণ বাংলাদেশের জনগনের মনের মনিকোঠায় তো হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি এটাও জানে হাসিনা পরবর্তী সময়ে কীভাবে অত্যাচার চালিয়েছে তারা বাংলাদেশে। ফলে হাসিনা ক্ষমতায় ফিরলে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক।
তবে ভয় কিন্তু শুধু একা বিএনপি পাচ্ছে। যদি বলি না। ভয় পাচ্ছে ইউনুসও। আপনি কি আমার সঙ্গে সহমত হবেন ? ইউনুস কেন ভয় পাচ্ছে একটু জানাই আপনাদের। দেখুন, ইউনুস বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তার সরকার বৈধ কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন বিস্তর। তাছাড়া তার সময়ে সংখ্যালঘু ইস্যুতে উত্তাল হয় বাংলাদেশ। এখনও সেখানের সংখ্যালঘুরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটান। এছাড়াও ইউনুসের স্নেহধন্য এনসিপি। নাহিদ ইসলামরা বেশ হম্বিতম্বি করে দল তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তা তো তলানিতে। তারাই নির্বাচনে লড়াই করতে পরবেন কিনা সেটাই এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ তাদের দলের প্রতীক নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। একটু জানাই এনসিপি-র ঠিক কি সমস্যা। এনসিপি চায় শাপলা প্রতীক। তবে এনসিপি-কে শাপলা প্রতীক দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার জানান, নির্বাচন কমিশনের তালিকায় যে প্রতীকগুলো রয়েছে, সেই প্রতীকগুলো দেওয়া হবে। তাই শাপলা প্রতীক এখনই দেওয়া হবে না। অন্যদিকে হাসিনা ভারতে থেকেও অডিও বার্তার মাধ্যমে ক্রমাগত বিঁধে গিয়েছেন ইউনুসকে। ইউনূস গত ১৩-১৪ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। বারবার বলে এসেছেন হাসিনা।
এবার বলব বাংলাদেশ সংবিধান কি বলছে। মানে ইউনুসের ভয় পাওয়ার আরও একটা কারণ বলব আপনাদের। দেখুন বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কিত কোনো বিধান নেই। সেখানে কি বলা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, অন্তবর্তী সরকার একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বা জরুরি অবস্থা মোকাবেলার জন্য গঠিত একটি অস্থায়ী সরকার। যা সংবিধানের বাইরে থেকে কাজ করে।
ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কোনো আইনি দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়। কারণ এটি ২০২৪ সালে অশান্ত বাংলাদেশের একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত সরকার। এবং রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপদেশমূলক মতামত গ্রহণ করে অন্তবর্তী সরকার গঠন করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতায় থাকা সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ওই সরকারই বিজয়ী রাজনৈতিক দল বা জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তাহলে মানে কি দাঁড়াল, আসন্ন নির্বাচনে লড়তে হলে ইউনুসকে কোনও একটা রাজনৈতিক দলের লেজ ধরে লড়াই করতে হবে। আর ইউনুস যা ক্ষমতালোভী সেটা তিনি করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
এবার বলি, রাতে ইউনুস সাহেব কি কোনও দুঃস্বপ্ন দেখেছেন ? তাই তড়িঘড়ি আগেই প্রতিপক্ষকে ডিসকোয়ালিফাই করে দিলেন। আরে বয়স হচ্ছে তো। আর এই ৮৫ বছরে এসে কেই বা পরাজয়ের ধকল সইতে চায়। আসলে ইউনুস স্বপ্ন দেখেছেন থুড়ি দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। আওয়ামী লীগ লড়লে ইউনুসের পরাজয় নিশ্চিত। আর রাজনীতির কারবারিরা বলছেন, সেই আঁতকে ওঠা দুঃস্বপ্ন দেখে আগেই প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে আগেই খেলা থেকে ডিসকোয়ালিফাই করার কৌশল নিয়েছেন ইউনুস। কোন খেলা সেটা নিশ্চয়ই আপনাকে আর বলে দিতে হবে না। তাও একবার বলছি, আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের নির্বাচনের খেলা থেকে আগেই ডিসকোয়ালিফাই করে দেওয়ার কথা বলছি।
আসলে ইউনুস এই কয়েক দিন ধরে খুব ঘেঁটে রয়েছেন। বিশেষ করে ওই সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে একটি জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল একটি সংগঠন। মূলত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের উপর ওই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। তাঁদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছিল। বলি সেই সমীক্ষার ফলাফল আপনাদের। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের যুবসমাজের একটা বড় অংশ হাসিনার দলকে সমর্থন করেন। তরুণ প্রজন্মের অর্থাৎ যাদের বয়স ৩৫ বছর পর্যন্ত তাঁদের থেকে তাঁদের থেকে ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পেতে পারে আওয়ামী লীগ। এই রিপোর্ট দেখে ইউনুস সাহেব তো আরও ঘেঁটে ঘ।
তবে ওই জনমত সমীক্ষার রিপোর্টে একেবারে এক নম্বরে রাখা হয়েছে খালেদা জিয়ার দল বিএনপি-কে। বিএনপি-র প্রতি বাংলাদেশের মানুষ সমর্থন দিয়েছে ৩৮.৭৬ শতাংশ। জামাতকে সমর্থন করেছেন ২১.৪৫ শতাংশ মানুষ। এনসিপি-কে সমর্থন করেছেন ১৫.৮৪ শতাংশ মানুষ। আপনাদের জানিয়ে রাখি এই জনমত সমীক্ষার রিপোর্ট কিন্তু ফাইনাল নয়। এটা একটা পূর্বাভাস মাত্র।
তবে কোন কোন দল বাংলাদেশের নির্বাচনে লড়াই করবে সেটা তো সময় বলবে। কিন্তু মোদ্দা কথা হচ্ছে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়া দিকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হচ্ছে। ফলে হাতে মাত্র হাতে মাত্র তিন থেকে চার মাস সময়। নির্বাচনের একেবারে জোর প্রস্তুতি চলছে কমিশনে। বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসিরউদ্দিন জানান, নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে না হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। রমজানের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সব বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ কোনো কর্মকর্তা যাতে নির্বাচনী দায়িত্বে না থাকেন, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনও গোষ্ঠীর চাপের কাছে কমিশন মাথা নোয়াবে না।