দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই ফের বিতর্কে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। এবার বিতর্কের কেন্দ্র পঞ্জাবের লুধিয়ানা। ধর্মান্তরণ, ইসলাম এবং আবদুল্লা প্রসঙ্গে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে সরব হয়েছেন লুধিয়ানার শাহী ইমাম মৌলানা উসমান রহমানি লুধিয়ানভি। শুধু আপত্তি জানানো নয়, ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও তুলেছেন তিনি। ক্ষমা না চাইলে পুলিশে অভিযোগ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন শাহী ইমাম। ঠিক কী বলেছিলেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী? কেন তাঁর বক্তব্যে আপত্তি শাহী ইমামের? আর আবদুল্লা প্রসঙ্গই বা কোথা থেকে এল?

আর প্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ
এক বিতর্ক শেষ হতে না হতেই আরেক বিতর্কের কেন্দ্রে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। কিছুদিন আগেই বাংলায় দুর্গাপুজোর সময় মাছ-মাংস খাওয়া এবং রান্না নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান। তাঁর বক্তব্য ঘিরে বাংলায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এমনকি যাঁরা দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খাবার খান, তাঁদের পাখণ্ডী অর্থাৎ ভণ্ড বলেও মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। সেই মন্তব্যের পর বিজেপির বঙ্গ নেতৃত্বও জানিয়েছিল, ওই বক্তব্য ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত মত।
এবার সেই বিতর্কের রেশ কাটার আগেই পঞ্জাবে নতুন বিতর্ক। লুধিয়ানায় চলছে শ্রী হনুমন্ত কথা। সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী পঞ্জাবে দু’টি বিষয় বন্ধ করার কথা বলেন-নেশার কারবার এবং ধর্মান্তরণ। তিনি বলেন, যাঁরা গুরু গ্রন্থ সাহিবকে মানেন, তাঁদের অন্য ধর্মে ধর্মান্তরণের জন্য প্রভাবিত করা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, ধর্মান্তরণের বিরুদ্ধে তিনি শিখ ভাইদের পাশে থাকবেন। আর এই বক্তব্যের মাঝেই আসে সেই মন্তব্য, যা নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। ধর্মান্তরণের প্রসঙ্গেই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী ভাইয়া কো সইয়াঁ করার মতো মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই আপত্তি জানান লুধিয়ানার শাহী ইমাম মৌলানা উসমান রহমানি লুধিয়ানভি।শাহী ইমামের বক্তব্য, ধর্ম প্রচার করার অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। কিন্তু ধর্ম প্রচারের মঞ্চ থেকে অন্য কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায় সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, লুধিয়ানা এমন একটি জায়গা যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে এমন মন্তব্য বরদাস্ত করা হবে না।
এখানেই শেষ নয়। নতুন বিতর্কে উঠে এসেছে আবদুল্লা প্রসঙ্গও। শাহী ইমাম প্রশ্ন তুলেছেন, ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্যে আবদুল্লা-কে ঘিরে যে প্রসঙ্গ এসেছে, সেখানে দুবাইয়ের একজন মুসলিম এবং পঞ্জাবের একজন মুসলিমকে আলাদা করে দেখার যুক্তি কী? অর্থাৎ, ধর্মের পরিচয়ের ভিত্তিতে একই সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষেত্রে আলাদা মানদণ্ড কেন থাকবে-এই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি। এরপরই সরাসরি ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান শাহী ইমাম। তিনি বলেন, বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। না হলে পুলিশে অভিযোগ করার পথেও হাঁটবেন তিনি। এমনকি অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন শাহী ইমাম। এ নিয়ে একটি জরুরি বৈঠকও ডেকেছেন শাহী ইমাম। ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সামাজিক সৌহার্দ্য বজায় রাখতে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে এই বিতর্কে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্যও সামনে এসেছে। ইসলাম বা কোনও ধর্মের বিরোধিতা করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়-এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কোনও ধর্ম, মত বা পরম্পরার বিরুদ্ধে নন। বরং তাঁর আপত্তি সেই সমস্ত রীতিনীতি বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে, যা তাঁর মতে সমাজে অশান্তি বা ধর্মান্তরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। তাঁর বার্তা-জাগো এবং জাগাও।
অর্থাৎ, একদিকে শাহী ইমামের অভিযোগ-ধর্ম প্রচারের নামে অন্য ধর্ম সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে। অন্যদিকে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্য-তাঁর উদ্দেশ্য কোনও ধর্মকে আঘাত করা নয়, বরং ধর্মান্তরণ এবং সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলা। এই ঘটনাকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন-ধর্মীয় মঞ্চে কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায় নিয়ে বক্তব্যের সীমা কোথায়? কারও নিজের ধর্মের প্রচার এবং ধর্মান্তরণের বিরোধিতা করা এক বিষয়। কিন্তু সেই বক্তব্যে অন্য ধর্মের মানুষ নিজেদের অপমানিত বা আক্রান্ত মনে করলে তার সামাজিক প্রভাব কতটা হতে পারে, সেটাই এখন লুধিয়ানার বিতর্কের কেন্দ্রে।
এর আগেও দুর্গাপুজোয় আমিষ-নিরামিষ খাবার নিয়ে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্য বাংলায় বিতর্ক তৈরি করেছিল। এবার পঞ্জাবে ধর্মান্তরণ, ইসলাম এবং আবদুল্লা প্রসঙ্গ নিয়ে ফের তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। একদিকে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্য-ধর্মান্তরণ রুখতে হবে, সমাজকে সচেতন করতে হবে। অন্যদিকে লুধিয়ানার শাহী ইমামের দাবি ধর্মের প্রচারের নামে কোনও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা যাবে না। ক্ষমা চাওয়ার দাবি, জরুরি বৈঠক এবং পুলিশে অভিযোগের হুঁশিয়ারি সব মিলিয়ে লুধিয়ানায় ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীকে ঘিরে বিতর্ক এখন আরও তীব্র। এখন দেখার, শাহী ইমামের এই দাবির পর ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী কি তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন, নাকি নিজের বক্তব্যেই অটল থাকবেন।