কীভাবে রাজনীতিতে তারেক রহমানের প্রবেশ? কীভাবে তিনি বিএনপির ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এলেন?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি ২৯৯-র মধ্যে ২১৩টি আসনে জয়ী । দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুই আসনে জয়ী হন। দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান, আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক বিতর্ক। সবকিছুকে ছাপিয়ে ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বলা যেতে পারে বিএনপির তারেক রহমানের হাতে বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয়। কিন্তু কীভাবে রাজনীতিতে তারেক রহমানের প্রবেশ? কীভাবে তিনি বিএনপির ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এলেন? নির্বাসন পর্বেও কীভাবে দলকে সংগঠিত রেখেছিলেন তিনি ? জাতীয় নির্বাচনে ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়ার পিছনে তাঁর কৌশল কতটা কার্যকর ছিল ?
একটা নাম৷ তারেক রহমান৷ সেই নামকে ঘিরেই নতুন করে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ৷ খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে যে দলের কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান হিসাবে অভিষিক্ত হয়েছেন তারেক রহমান৷ বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে তিনি৷ তাঁর প্রত্যাবর্তনেই প্রত্যাশাপূরণের স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশের মানুষ৷ ঢালাও ভোট পেয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে তাঁর দল বিএনপি৷ তারেকই হতে চলেছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

২০ নভেম্বর, ১৯৬৫ –
ঢাকায় জন্ম তারেক রহমানের। বাংলাদেশের প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তিনি। মা খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। ফলে জন্ম থেকেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা করেন তারেক। আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি নতুন করে সংগঠিত হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।
১৯৮৮ –
বিএনপি-র সাধারণ সদস্য হিসাবেই নাম নথিভুক্ত করিয়েছিলেন তারেক রহমান৷ রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন গাবতালির বগরা থেকে৷ ১৯৯১ সালে যখন সেনা শাসন থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার পথে ফিরছে বাংলাদেশ, সেই সময় মা খালেদা জিয়ার হয়ে প্রথমবার সক্রিয় ভাবে প্রচারে থাকতে দেখা গিয়েছিল তারেককে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের সরকার থাকাকালীন বিরোধীর ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি৷ ২০০১ সালে ফের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি৷ প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া৷ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ২০০৪ সালে হয় ঢাকা গ্রেনেড হামলা৷ আওয়ামী লীগের মিছিলে হওয়া সেই হামলায় তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকে নিশানা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে৷ মারা যান ২৪ জন মানুষ। এইসব রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটার মধ্যেই তারেক রহমানের বড় হয়ে ওঠা। তবে রাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রবেশ বলতে গেলে তা নব্বইয়ের দশকে। বিএনপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। যদিও সরাসরি ছাত্রদলের সভাপতি হননি, সংগঠনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্কে প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে তাঁর।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসে। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একাধিক দুর্নীতি মামলায় তারেক রহমান গ্রেফতার হন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। তার পরেই বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা যায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। সেই সময়েই দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হন তারেক। ১৮ মাস জেলে থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয় তাঁকে। জেলে খালেদা-পুত্রের উপর অত্যাচার করারও অভিযোগ ওঠে। পরে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে তিনি আর দেশে ফেরেননি।
এই দীর্ঘ নির্বাসন পর্বে তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন। তবে নির্বাসনে থেকেই তিনি দলকে পরিচালনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল মিটিং, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনলাইন ব্রিফিং। এসবের মাধ্যমে তারেক রহমান ধীরে ধীরে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো পুর্ণগঠন করেন। তিনি তারুণ্যের রাজনীতি ও ডিজিট্যাল বাংলাদেশে গণতন্ত্র। এই দুই স্লোগানকে সামনে আনেন। তরুণ প্রার্থী, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের যুক্ত করে নতুন ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা করেন। এবারের ভোটে ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে বেশ কিছু পন্থা অবলম্বন করেন তারেক রহমান। এবারে এককভাবে নয়, বরং কৌশলগত জোট গঠন করে নির্বাচনে নামে তাঁরা। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সহানুভূতির স্রোতকে কাজে লাগিয়েছে তাঁরা। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য, দলের ওপর দীর্ঘদিনের দমন পীড়নের অভিযোগকে সামনে এনে মাস্টার স্ট্রোক দিয়েছে বিএনপি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দুটি আসনেই জয় পেয়েছেন তিনি। ঢাকা-১৭ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৩ জন। এর মধ্যে ভোট পড়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৮৮টি। বাতিল হয় ২ হাজার ২১১টি। বৈধ ভোট হয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭৭টি। ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে তারেক রহমান ৪ হাজার ৩৯৯ ভোটের ব্যবধানী জয়ী হয়েছেন। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই আসনে তারেক রহমান পান ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা নাটকীয়। ক্ষমতার ছায়ায় উত্থান, আইনি ঝড়. নির্বাসন, ডিজিটাল পুনরাগমন, এবং অবশেষে নির্বাচনী বিজয়। ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়া বিএনপির জন্য শুধু সংখ্যাগরিষ্টতা নয়। এটি একটি প্রজন্ম থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক।