ইরান নিয়ে বিবৃতি, মুখ পুড়ল বাংলাদেশের !

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে বিবৃতি জারি করা হল। কোনও চাপের মুখে পড়ে বিবৃতি ?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনই। এছাড়াও এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এই ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শোক ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোকও প্রকাশ করেছেন। বিবৃতি জারি করা হয়, বাংলাদেশের তরফেও। যাকে ঘিরে আলোড়ন পড়ে যায় গোটা বিশ্বে। কী এমন উল্লেখ রয়েছে সেই বিবৃতিতে? যুদ্ধের কোন পক্ষে দাঁড়াল বাংলাদেশ? কী এমন লিখল, যাতে অনেকে মনে করছেন, কারোর চাপে পড়ে বাংলাদেশের এই বিবৃতি?

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনামূলক পরিস্থিতির মধ্যে রবিবার বিবৃতি জারি করা হয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে। কিন্তু সেই বিবৃতি জারির পর থেকে সমাজ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জার্তিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করেন বাংলাদেশ একপেষে অবস্থান নিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ কি কোনও চাপের মুখে পড়ে এই বিবৃতি দিয়েছে। তবে এই সমালোচনার মুখে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে আরও এক বিবৃতি দেওয়া হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে ব্যথিত হওয়ার কথা জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে বলা হয় আন্তর্জার্তিক আইন লঙ্ঘন করেই এই হামলা চালানো হয়। ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় মৃত্যু হয় দেশটির ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের । এছাড়া মৃত্যু হয় আর বেশ কয়েকজনের । তালিকায় রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা। এছাড়াও বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। এই ঘটনার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নানারকম বিবৃতি দেওয়া হয়। নিন্দা জানানো হয় বেশ কয়েকটি দেশ থেকে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন খামেনেইয়ের হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের পাল্টা হিসাবে শনিবার ইরান পাল্টা হামলা চালায়। একই সঙ্গে মধ্য প্রাচ্যের দেশ বাহারাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব সহ আরও বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। এমন অবস্থায় রবিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়। যেখানে দেখা যায়, ইরানে পাল্টা হামলায় মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে দাবি করে এর নিন্দা জানানো হয় বাংলাদেশ সরকারের তরফে। তবে বাংলাদেশের এই বিবৃতিতে কোথাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে ইরানে হামলার ঘটনারও কোনও নিন্দা জানানো হয়নি। রবিবার সন্ধ্যায় বিবৃতি প্রকাশের পর সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা সমালোচনা- আলোচনা দেখা যায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন অবস্থানকে একপেশে মনে করেছেন অনেকে।

কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করেন এ ধরণের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ন্যায় সঙ্গত হওয়া উচিত ছিল। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, হতে পারে এই বিবৃতি কারো চাপে পড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজে থেকেও দিতে পারে। সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না তারা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে এও বলেন, চলমান শত্রুতা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, এবং বেসামরিক জনগণের কল্যাণকে বিপন্ন করবে। বাংলাদেশের বিবৃতিতে উল্লেখ রয়েছে এই দিকগুলি।

শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পরই এর জবাব দিতে শুরু করে ইরান। প্রথম ইজরায়েল ও পরে মধ্য প্রাচ্যের যে সব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে. সেসব লক্ষণ করে, হামলা চালায় ইরান। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকও করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। সেখানে বাংলাদেশ সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানো, উত্তেজনা ত্যাগ ও অবিলম্বে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের কথা বলে।

রবিবার ভোরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেইয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলে উত্তেজনা আরও বাড়ে মধ্য প্রাচ্যে। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার তীব্র প্রতিবাদও জানানো হয়। রবিবার বিকালে বিক্ষোভ দেখায় বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়েত ইসলামীয়। এই অবস্থার মধ্যে রবিবার বিকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনায় একটি বিবৃতি দেয়। এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানেই বলা রয়েছে. দেশের অবস্থান হবে যে কোনও ধরণে্র আগ্রাসন বিরোধী। কিন্তু এই ইস্যুতে বাংলাদেশ বেশ সতর্ক অবস্থানে থেকেছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল। তাঁরা বলছেন সংবিধান বলছে আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে থাকতে হবে। একই সঙ্গে কেউ যদি অবৈধ বল প্রয়োগ করে, তার বিরুদ্ধেও অবস্থান থাকা উচিত। তিনি মনে করেন, এই ইস্যুতে বর্তমান সরকারের উচিত ছিল সব পক্ষের নাম উল্লেখ করা। একই পক্ষে দুপক্ষের হামলার নিন্দা জানানো। কিন্তু সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি। চিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন মনসি ফয়জা আহমেদ। তিনি বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে. সেখানে ইরান আগে আক্রান্ত হয়েছে। ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরায়েল। যখন ইরান আক্রান্ত হয়েছে. তখন জবাব দিয়েছে তাঁরা। তিনি বলেন, যখন মধ্য প্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলি ব্যবহার করে ইরানে হামলা হচ্ছে, ইরান যখন আক্রান্ত হয়, তখন অবশ্যই তার অধিকার রয়েছে প্রত্যাঘাত করার। বাংলাদেশ এই বিবৃতি কারোর চাপে পড়ে দিয়েছে কিনা, এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আগ্রাসন তো আগে চালিয়েছে ইজরায়েল ও আমেরিকা। সেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন এমন অবস্থান নিচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে যে ধরণের বক্তব্য আশা করা হয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি।

তবে এত কিছু সমালোচনার মুখে আরও এক বিবৃতি দিতে দেখা যায় বাংলাদেশকে। সেখানে বলা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছি্ল। এটা আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে, সংঘাত কখনও সমাধান এনে দেয় না। কেবল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার মাধ্যমেই বিরোধ সম্ভব।