বাংলাদেশ সফরে জাকির নায়েক। বাংলাদেশ কি নতুন করে মৌলবাদের পথে হাঁটছে ?
সূচনা পল্যে, সাংবাদিক: ভারতে ‘ওয়ান্টেড’ জাকির নায়েককে মনে আছে? একসময় ভারতেই থাকতেন। বহু বছর হল দেশছাড়া। সেই জাকির নায়েককে লাল গালিচা পেতে স্বাগত জানাতে চলেছে বাংলাদেশ। যে দেশে তাঁর চ্যানেল একসময় নিষিদ্ধ হয়েছিল, সেই দেশই এবার তাঁর সফরে অনুমোদন দিয়েছে। এই সফর ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক আলোড়ন, নিরাপত্তা সংশয়, আর একটা বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশ কি নতুন করে মৌলবাদের পথে হাঁটছে?

সন্ত্রাসবাদে উসকানি, ঘৃণামূলক বক্তব্য আর সাম্প্রদায়িক বিভেদের অভিযোগে ভারত ও বাংলাদেশ- দুই দেশেই নিষিদ্ধ ছিলেন জাকির নায়েক। ২০১৬ সালে ঢাকার ‘হলি আর্টিজান বেকারি’তে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য- হামলাকারীদের একজন জাকির নায়েকের বক্তৃতা শুনে চরমপন্থায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। তারপরই শেখ হাসিনা জাকির নায়েকের ‘Peace TV’ বন্ধ করে দেয় এবং জাকির নায়েককে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি ভারতেও NIA ইউএপিএ আইনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। দেশ ছাড়েন নায়েক, আশ্রয় নেন মালয়েশিয়ায়।
এবার সেই নিষিদ্ধ ধর্মপ্রচারকই বাংলাদেশে ফিরছেন
আর সেটি ঘটছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর
মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার
২৮ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত
জাকির নায়েককে বাংলাদেশ সফরের অনুমোদন দিয়েছে
এই এক মাসে তিনি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যাবেন, একাধিক ধর্মীয় সমাবেশ ও বক্তৃতা দেবেন- যেগুলো সরকারিভাবেই অনুমোদিত অনুষ্ঠান! তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত বাংলাদেশের ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো। আর এই খবরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সেক্যুলার ও সংখ্যালঘু মহলে। এটা প্রথমবার নয়। গত বছর পাকিস্তানেও একইভাবে জাকির নায়েককে ‘বিশেষ অতিথি’ হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। সেই সফরে তিনি দেখা করেছিলেন লস্কর-ই-তোইবা-র কয়েকজন কমান্ডারের সঙ্গে- যাঁরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জঙ্গি। পাক সফরের পর এবার বাংলাদেশে তাঁর সফর ঘিরে নতুন করে উগ্রপন্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা নিছক ধর্মীয় সফর নয়, এটা ধর্মের আড়ালে এক রাজনৈতিক বার্তা।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই বাংলাদেশে উগ্র ইসলামপন্থার উত্থান স্পষ্ট। জামাতে ইসলামির মতো সংগঠন একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ দখল করছে। রাজনৈতিক ময়দানে তাঁদের প্রভাবও বাড়ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলার খবর বেড়েছে, বিশেষত আহমাদিয়া সম্প্রদায় বারবার টার্গেট হচ্ছে। চরমপন্থী সংগঠনগুলো ইউনুস সরকারের উপর চাপ দিচ্ছে আহমাদিয়াদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করতে।

১৫ নভেম্বর এই দাবিতে ঢাকায় বিশাল মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে
সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের চরমপন্থী ধর্মগুরুদেরও
বাংলাদেশি ধর্মগুরু মুফতি এনায়েতুল্লা আব্বাসি প্রকাশ্যে বলেছেন- যেখানেই আহমাদিয়াদের পাওয়া যাবে, তাদের খুন করা হবে। এই বক্তব্যের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যা আরও আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উগ্রবাদই এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ‘হাতিয়ার’ হয়ে উঠছে। আর জাকির নায়েকের আগমন যেন সেই আগুনে ঘি ঢালার মতো ঘটনা।
ভারত বরাবরই জাকির নায়েককে ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় রেখেছে
তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে জোরপূর্বক ধর্মান্তর, ঘৃণামূলক বক্তব্য,
আর নিষিদ্ধ সংগঠন PFI-এর সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগ

এমন একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো- ভারতের কাছে নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক বার্তা। বিশেষজ্ঞদের দাবি- ইউনুস সরকার পাকিস্তানের পথে হাঁটছে। আর তাই নয়াদিল্লির চোখ এখন ঢাকা অভিমুখে। যদি জাকির নায়েক তাঁর সফরে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে দেখা করেন, তাহলে বাংলাদেশে উগ্রপন্থার জাল আরও মজবুত হবে। বুদ্ধিজীবীদের আশঙ্কা, এতে ভারতের পূর্ব সীমান্তেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। জাকিরের উগ্র বক্তৃতা তরুণ সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে, যা ২০১৬ সালের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ডেকে আনতে পারে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ইউনুস সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ,
বাংলাদেশ একসময় ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার উদাহরণ
আজ সেই দেশেই ধর্মের নামে বিভেদ বাড়ছে
বিশ্লেষকরা বলছেন- যেখানে অর্থনীতি ভঙ্গুর,রাজনীতি অস্থির, সেখানে ধর্মের কার্ড খেলে টিকে থাকার চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়-
বাংলাদেশ কি নতুন এক মৌলবাদী পর্বের মুখোমুখি? নাকি এ কেবল রাজনৈতিক কৌশল? জাকির নায়েকের সফর হয়তো ধর্মীয় ইভেন্ট, কিন্তু এর ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে রাজনীতি, কূটনীতি, আর নিরাপত্তার মাঠেও। পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু ইতিহাস বলছে- চরমপন্থা একবার মাথা তুললে, তাকে থামানো সহজ নয়।