শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদালতের।

হাসিনাকে মৃ্ত্যুদণ্ডের সাজা দিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিল বেঞ্চ। শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করার নেপথ্য়ে তিনটি কারণ তুলে ধরেন বিচারপতি। প্রথম,প্ররোচনা বা উস্কানিমূলক বার্তা। দ্বিতীয়, প্রতিবাদীদের হত্যার নির্দেশ। তৃতীয়, হত্যার বিরোধিতায় কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া।
শেখ হাসিনার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। অপর অভিযুক্ত প্রাক্তন পুলিশকর্তা আল-মামুন। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন করে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণা হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে আদালতকক্ষ।
শুরুটা এইভাবে করেছিলেন বিচারপতি। ছাত্রহত্যার ‘মাস্টারমাইন্ড’ শেখ হাসিনা। ঠিক এই ভাবেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে চিহ্নিত করলেন বিচারপতি। বিচারের নামে প্রহসন, ইউনুসের আদালতে দোষী সাব্যস্ত শেখ হাসিনা। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাডা়ই সাজা ঘোষণা। পাশাপাশি, এই মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ মহাপরিদর্শককেও দোষী সাব্যস্ত করল আদালত। হাসিনার বিরুদ্ধে কি কি অভিযোগ নিয়ে আসা হয়েছে একটু জানাই আপনাদের। ১৫০০ মানুষকে হত্যার অভিযোগ। আশুলিয়ার ৬ জনকে পুড়িয়ে খুনের নির্দেশ। উস্কানি মূলক ভাষণের অভিযোগ। ড্রোন, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাইদকে খুনের নির্দেশ। চানখাঁরপুর এলাকায় আন্দোলনরত ৬ জনকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ।
বিদ্বেষমূলক মন্তব্য থেকে হত্যার নির্দেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সবই করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। জানান বিচারপতি। ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে নিজের এক ঘনিষ্ঠকে মোট ২২৬ জন আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাসিনা। ৪৫৩ পাতার রায়ে বিচারপতি বলেন, যে সমস্ত ফোনালাপ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা এআই সহায়তায় তৈরি করা হয়নি। ছাত্রদের কথা শোনার পরিবর্তে আন্দোলনকে অবহেলা করেছেন হাসিনা। আন্দোলনকারী ছাত্রদের রাজাকার বলে অপমান করেছেন তিনি, রায়ের শেষ অংশ থেকে বিচারপতি পড়ে শোনান।
অন্যদিকে হাসিনার পক্ষে আইনজীবী দাবি করেন, কোনও হেলিকপ্টার আন্দোলন ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়নি। কাউকে অপমান করেননি শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমনে নিজে সরাসরি যোগও দেননি তিনি। আন্দোলনকারীদের সংখ্যাই সরকারি হিসাবে ৮০০। তা হলে দেড় হাজার আন্দোলনকারীর মৃত্যু হল কী ভাবে? প্রশ্ন তুলেন হাসিনার আইনজীবী।
হাসিনার সাজা ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে আওয়ামী লীগ সদস্যরা সেটা তো হতে পারে না। সোমবার কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি আগেই ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। রবিবার থেকেই উত্তপ্ত হয় বাংলাদেশ। রবিবার গভীর রাতে একাধিক বোমা বিস্ফোরণ হয় ঢাকায়। ইউনুসের পরামর্শদাতাদের একজনের বাড়ির বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঢাকার তিতুমীর কলেজের মূল ফটকের সামনে এবং আমতলি মোড় এলাকায় বিস্ফোরণ হয়। আরও বেশ কিছু এলাকায় বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই অশান্তি গুলি হয় মূলত রবিবার রাত দেড়টা নাগাদ। সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতি আরও ঘোরাল হয়।
সকাল থেকেই উত্তপ্ত বাংলাদেশ। বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে সাউন্ড গ্রাউন্ড ব্যবহারের নির্দেশ সেনাকে। বিক্ষোভকারীদের দেখা মাত্র গুলির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পনেরো হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ। পরিস্থিতি সামলাতে রাজপথে সেনা নামানো হয়েছে। ৩২ ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ। মুজিবের বাড়ির সামনে পে লোডারও দেখা যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনার একাধিক জায়গায় বিক্ষোভ।
কোটা সংস্কার বিরোধী আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের জুলাই-অগস্ট মাসে অগ্নিগর্ভ হয়েছিল বাংলাদেশ। আর হাসিনার রাজাকার মন্তব্য সেই আগুনে ঘি ঢালে। ঢাকা সহ গোটা বাংলাদেশেরই ছাত্র-যুবরা পথে নামে। আন্দোলনকারীদের উপরে গুলি চালানোর ঘটনা বিদ্রোহকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তখন প্রবল জনরোষ ও আন্দোলনের মুখে পড়ে ৫ অগস্ট বাংলাদেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। বন্ধু ভারত তাকে আশ্রয় দেয়। আর এখনও ভারতের আশ্রয়েই রয়েছেন তিনি। তবে বাংলাদেশ থেকে একাধিকবার হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। গত বছর ২৩ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। ভারত সেই বার্তা পাওয়ার কথা স্বীকারও করে। তবে সেই চিঠির কোনও জবাব দেয়নি ভারত, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫-এর মার্চ মাসে জানান প্রধান মহম্মদ ইউনূস।
প্রশ্ন হচ্ছে, এখন ভারত কি করবে, ভারত সরকারের কাছে এটা গুরুদায়িত্ব। কারণ ভারতের উপরে এবার চাপ বাড়াবে বাংলাদেশ। যেহেতু আদালত রায় দিয়ে দিয়েছে। ফলে ভারতকে এবার একটু ভাবতে হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ সেই চুক্তিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে, সেটাও দেখার। ফলে এই নিয়ে টানাপোড়েন চলবে। এর মধ্যেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন রয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। ভারত এখন শেখ হাসিনাকে অন্য় দেশে পাঠিয়ে নিষ্কৃতি পাওয়ার মতো জায়গাতেও নেই। কারণ, ক্ষমতা হারিয়ে হাসিনা সোজা ভারতে আসেন। আর সেই থেকেই ভারতের কূটনৈতিক আশ্রয়েই রয়েছেন শেখ হাসিনা।
কথায় বলে হিস্টিরি রিপিটস ইট সেলফ– একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশে গঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল। তখন ঢাকায় ‘রাজত্ব’ আওয়ামী লিগের। প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা। সেই তাঁর গড়া আদালতেই সোমবার আরও একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাজা ঘোষণা হল। যে মামলার মূল অভিযুক্ত খোদ শেখ হাসিনাই। ২০১০ থেকে ২০২৫, এই ১৫ বছরে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোট ৫৭টি রায় দিয়েছিল ট্রাইবুন্যাল। যা সোমবার রায় দেয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কালে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের।
তবে সাজা ঘোষণা ঘিরে হাসিনার মধ্যে একেবারে ডোন্ট কেয়ার মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। সাজা ঘোযণার আগে একটি অডিও বার্তায় মুজীব কন্যা বলেন, কাউকে তিনি পরোয়া করেন না, আল্লা জীবন দিয়েছেন, তিনিই নেবেন। বিচার করুক। ওসব বিচারের আমি পরোয়া করি না। শুধু মানুষের জন্য কাজ করব। আমি ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে জায়গা দিয়েছিলাম। তাঁরা নির্যাতিত ছিলেন। এর চেয়ে বেশি মানবিক কাজ আর কী হতে পারে? দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন,হামলা, মামলা দিয়ে আমার কণ্ঠ বন্ধ করতে পারবে না। আগামী দিনে আওয়ামি লিগ আরও শক্তিশালী হবে। আওয়ামী লীগ মাটি থেকে উঠে আসা দল। কোন ক্ষমতা দখলকারীর পকেট থেকে তা তৈরি হয়নি, ফলে ইউনুসের পতন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সমর্থকরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।