স্মরণে বাপ্পি লাহিড়ী

আশির দশকে অন্যতম জনপ্রিয় নাম বাপ্পি লাহিড়ী। বলিউডের আই অ্যাম আ ডিস্কো ড্যান্সার থেকে শুরু করে চলতে চলতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রাখ না, কভি অলবিদা না কেহ না,শারাবি-র মতো জনপ্রিয় এই হিন্দি গানগুলিতে কন্ঠ দিয়েছিলেন ডিস্কো কিং।

রিয়া হালদার, সাংবাদিক : ২৭ নভেম্বর, দিনটি বড্ড স্পেশাল জানেন তো। কারণ, এই দিনটিতে ডিস্কো কিং এর মতো একজন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর আবির্ভাব হয়েছিল। সানগ্লাসে ঢাকা চোখ। ঘাড় পর্যন্ত চুল। গলায় নানা রকমের সোনার চেইন। হাতে একাধিক সোনার ব্রেসলেট চোখে পড়ার মতো। আর মুখে সব সময় হাসি। যিনি মাত্র তিন বছর বয়সেই টেবিল চাপড়ে তুমুল ঝড় তুলেছিলেন। তাঁর বাদ্যযন্ত্রের সুর থেকে কণ্ঠস্বর আজও সংগীত প্রেমীদের হৃদয়জুড়ে। আমি বলছি বাপ্পি লাহিড়ীর কথা। খুব অল্প বয়সেই আবিষ্কৃত হয়েছিল বাপ্পি লাহিড়ীর সংগীত প্রতিভা। বর্তমানে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে না থাকলেও তাঁর জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। তাঁর বর্ণনা যত শব্দেই হোক, তা কম হবে। সংগীত দুনিয়ায় তাঁর অবদান, একের পর এক সৃষ্টি, কোনও শব্দেই বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আটের দশকের সবচেয়ে হিট গানগুলির একদিকে যেমন তিনি রচয়িতা, তেমন তাঁরই কণ্ঠ মঞ্চ মাতিয়ে তুলেছে বারবার। বাপ্পিদা বলিউডের ‘ডিস্কো কিং’ হিসেবেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। তাঁর অনবদ্য কন্ঠস্বরের জন্য একটা সময় সকলের থেকে তাঁকে আলাদা করা যেত। এমনকী তাঁর বাদ্যযন্ত্রের সুরও এতটাই সকলের থেকে আলাদা ছিল যে ভক্তেরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাঁর সুর-তাল সনাক্ত করতে পারে। সেই ‘ডিস্কো কিং’-এর জন্মদিনে অজানা কিছু তথ্য জানাতে এই প্রতিবেদন। বাপ্পিদার আসল নাম অনেকেই জানেন না। বাপ্পি লাহিড়ীর নামের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সংগীতের ছন্দ থাকলেও তাঁর আসল নাম ছিল অলোকেশ লাহিড়ী। তা থেকে পরবর্তীকালে তিনি বাপ্পি লাহিড়ি নামে পরিচিত হন। সুরের জগতে অনবদ্য় অবদান। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ৩৩টি চলচ্চিত্রের জন্য ১৮০টিরও বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন।

আশির দশকে অন্যতম জনপ্রিয় নাম বাপ্পি লাহিড়ী। বলিউডের আই অ্যাম আ ডিস্কো ড্যান্সার থেকে শুরু করে চলতে চলতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রাখ না, কভি অলবিদা না কেহ না,শারাবি-র মতো জনপ্রিয় এই হিন্দি গানগুলিতে কন্ঠ দিয়েছিলেন ডিস্কো কিং। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা সিনেমা ‘অমরসঙ্গী’তে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’সহ ‘আশা ও ভালোবাসা’, ‘আমার তুমি’, ‘অমর প্রেম’ প্রভৃতি ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছেন। অসংখ্য গানের জন্ম দিয়েছেন তিনি। ভারতের মতো বাংলাদেশেও দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল বাপ্পি লাহিড়ীর। ২০২০ সালে তাঁর শেষ গান ছিল ‘বাগি-৩’-এর জন্য। বাপ্পি লাহিড়ীর শেষ রচনা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল৷ ভক্তিমূলক গান গণপতি বাপ্পা মরিয়ার জন্য গানটি তৈরি করেছিলেন। ২০২২ সালের ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি মুম্বইয়ের ক্রিটিকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সেদিনই শেষ হয়েছিল বাপ্পি লাহিড়ীর ৬৯ বছরের পথ চলা। তাঁর গান নিয়ে তিনি যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, তেমনই তাঁর পোশাকও ছিল বরাবরের আকর্ষণের কেন্দ্রে। বাপ্পি লাহিড়ী মানেই ভক্তদের কাছে আদ্যোপান্ত ‘সোনায় মোড়া’ এক মানুষ। তাঁকে বলিউডের গোল্ডম্যান বলা হতো। এমনকি তাঁর গয়না ব্যবহার নিয়ে নানা রসিকতাও শোনা গিয়েছে কখনও কখনও। কেন গয়না পরতেন, তার ব্যাখ্যাও মিলেছিল বাপ্পি লাহিড়ীর। তিনি জানিয়েছিলেন, বিখ্যাত সংগীতশিল্পী এলভিস প্রিসলির দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত। তাই তার এমন সাজপোশাক। এলভিস প্রিসলি সোনার হার পরতেন। বাপ্পি বলেন, আমি প্রিসলির বড় ভক্ত ছিলাম। আমি ভাবতাম, যদি কোনো দিন সফল হই, তাহলে নিজের অন্য রকম ভাবমূর্তি গড়ে তুলব। স্রষ্টার আশীর্বাদে সোনার মাধ্যমে সেটা করতে পেরেছি। তিনি বলেন, আগে মানুষ ভাবত, আমি সবাইকে দেখানোর জন্যই সোনার গয়না পরি। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সোনা আমার কাছে সৌভাগ্যের বাহক, আমার এগিয়ে যাওয়ার সাহস।’বাপ্পির ভাষায়, ‘আমার স্রষ্টার নাম সোনা! যখন থেকে সোনার গয়না পরা শুরু করেছি, আমার একের পর এক গান হিট করা শুরু করেছে। সোনা আসলে আমার জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক। তাই এত সোনার গয়না কিনি আর পরি। জানেন কি,সংগীতশিল্পীর রেখে যাওয়া সোনার পরিমাণ কত? ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ব্যবহৃত সোনা-রুপার পরিমাণ ৫ কেজি ৩৫৪ গ্রাম। এই সবই তাঁর গলার চেইন, ব্রেসলেট, হাতের ঘড়িসহ অন্যান্য ব্যবহৃত অলংকার।

বাপ্পি লাহিড়ীর কথা বলতে গিয়ে উঠে আসে আরও এক জনপ্রিয় কিংবদন্তির কথা। তিনি হলেন কিশোর কুমার। বহুগুন সম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি ছিলেন বাপ্পি লাহিড়ীর মামাও। বাপ্পি লাহিড়ী সাফল্যের পিছনে মামা কিশোর কুমারের আশীর্বাদ সর্বদাই ছিল। অনেকেই বলেন তা। একটি মিউজিক্যাল রিয়েলিটি শোতে, বাপ্পিদা বলেছিলেন যে তাদের রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, কিশোর কুমারের মা বাপ্পি লাহিড়ির মাকে কন্যা হিসাবে দেখতেন। তিনি তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন। এমনকী তাঁর নিজের ছেলে অমিত কুমার এবং সুমিত কুমারের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন বাপ্পি লাহিড়ীকে। ১৯৫২ সালের ২৭ নভেম্বর জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাপ্পি। দীর্ঘদিন বাংলা ও হিন্দি ছবির গান গেয়েছেন, সুর দিয়েছেন। ছিল গায়কের নিজস্ব কায়দাও, যা তাঁকে হিন্দি ছবির জগতে অন্য রকম পরিচিতি দিয়েছিল। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার এবং সম্মান। তাঁরই জন্মদিনে অনেক শুভেচ্ছাবার্তা অনুরাগীদের।