অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি ইতিমধ্যেই একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করছে এবং খুব শীঘ্রই প্রথম দফায় প্রায় ১০০টি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ২০২৬-এ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলার রাজনৈতিক ময়দান ক্রমশ গরম হয়ে উঠেছে, আর সেই প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে নতুন কৌশল নিয়ে এগোতে শুরু করেছে ইন্ডিয়ান ন্যশনাল কংগ্রেস। গত বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট-এর সঙ্গে জোট করেও বহু আসনে তৃতীয় স্থানে নেমে যেতে হয়েছিল কংগ্রেসকে, ফলে সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার দল অনেক বেশি পরিকল্পিতভাবে প্রার্থী বাছাইয়ের পথে হাঁটছে। দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, এআইসিসি অর্থাৎ অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি ইতিমধ্যেই একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করছে এবং খুব শীঘ্রই প্রথম দফায় প্রায় ১০০টি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে। এই তালিকায় অভিজ্ঞ নেতা, প্রাক্তন সাংসদ-বিধায়ক এবং নতুন প্রজন্মের মুখ- সব মিলিয়ে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে একদিকে সংগঠনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগে, অন্যদিকে তরুণ ভোটারদেরও আকৃষ্ট করা যায়।
এই প্রার্থী তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন দলের হেভিওয়েট নেতারা। প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী-কে ইতিমধ্যেই দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে এবং সূত্রের খবর, তিনি বহরমপুর কেন্দ্র থেকেই প্রার্থী হতে পারেন। অন্যদিকে বর্তমান প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকার-কে মালদহের কোনও আসনে দাঁড় করাতে চাইছে এআইসিসি, যদিও দলের একাংশ আবার তাঁকে তাঁর পুরনো কেন্দ্র শ্রীরামপুর থেকেই লড়ার পক্ষে মত দিয়েছে। প্রাক্তন সাংসদ মৌসম বেনজির নূর-এর ক্ষেত্রেও মালদহ জেলার কোনও আসনই সম্ভাব্য বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখনও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে প্রাক্তন বিধায়ক আলি ইমরান রামজ ইতিমধ্যেই গোয়ালপোখর এবং চাকুলিয়া- দুটি কেন্দ্রেই নিজের মতো করে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন, যদিও দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে শেষ পর্যন্ত চাকুলিয়া থেকেই প্রার্থী করতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে। আরেক প্রাক্তন বিধায়ক নেপাল মাহাতো-কে তাঁর পুরনো পুরুলিয়া কেন্দ্র থেকেই লড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে এই পুরো কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল- নতুন প্রজন্মকে সামনে আনা। কংগ্রেস বুঝতে পারছে যে শুধুমাত্র অভিজ্ঞ নেতাদের উপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সেই কারণেই ছাত্র ও যুব সংগঠন থেকে একাধিক নতুন মুখকে প্রার্থী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভানেত্রী প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী-কে হাওড়ার কোনও একটি আসন থেকে প্রার্থী করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রতীকীভাবে যুব নেতৃত্বকে সামনে আনার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে প্রাক্তন ছাত্র নেতা এবং বর্তমানে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়-কে রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হতে পারে, যা শহুরে ভোটব্যাঙ্কে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
এর পাশাপাশি বর্ধমান, দিনাজপুর এবং মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন আসনে ছাত্র-যুব সংগঠনের সক্রিয় কর্মীদের প্রার্থী করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। যদিও যুব সংগঠনের এখন কোনও স্থায়ী সভাপতি নেই এবং একটি লিডারশিপ কমিটি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, তবুও সেই কমিটির সদস্যদের মধ্যে থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এই পদক্ষেপকে অনেকেই কংগ্রেসের সংগঠন পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, জোট রাজনীতির প্রশ্নে এখনও স্পষ্ট কোনও অবস্থান নেয়নি কংগ্রেস। শুরুতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে আবারও সিপিএমের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে, এবং সেই হিসেবেই অনেক নেতা বিভিন্ন কেন্দ্রে বিএলএ-২ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই এখন আর প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, যা দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
এই পুরো পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। একদিকে যেমন শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে, অন্যদিকে নিজেদের ভিতরের দুর্বলতাকেও কাটিয়ে উঠতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের এই নতুন কৌশল একদিকে যেমন বাস্তবসম্মত, তেমনই ঝুঁকিপূর্ণও। কারণ হেভিওয়েট নেতাদের উপর নির্ভরতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নতুন মুখদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কংগ্রেসের কাছে শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ। তারকা প্রার্থী, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, এবং যুব মুখ- এই তিন স্তরের সমন্বয়ে দল একটি নতুন বার্তা দিতে চাইছে ভোটারদের কাছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের সংগঠন, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং সবচেয়ে বড় কথা- মানুষের আস্থার উপর। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শেষ কথা বলে ভোটারই, এবং সেই পরীক্ষাতেই এবার নিজেদের প্রমাণ করতে হবে কংগ্রেসকে। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।