২০২৬ সালে NPS-এ কী কী বড় পরিবর্তন হয়েছে? সরকারি ও বেসরকারি কর্মীদের নিয়মে কী পার্থক্য? অবসরের সময় কত টাকা একসঙ্গে তোলা যাবে? এবং সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এর প্রভাব কী হতে পারে?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ভারতের অবসরকালীন সঞ্চয় ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। ২০২৬ সাল থেকে ন্যশনাল পেনশন সিস্টেম বা NPS-এর নিয়মে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলি এনেছে Pension Fund Regulatory and Development Authority বা পিএফআরডিএ। এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হল- বেসরকারি কর্মীদের জন্য আরও বেশি নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি দেওয়া এবং সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- এবার থেকে সরকারি কর্মী এবং বেসরকারি কর্মীদের জন্য NPS-এর নিয়ম আলাদা করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
NPS কী?
প্রথমেই সংক্ষেপে জানা যাক NPS কী। NPS বা National Pension System হল একটি দীর্ঘমেয়াদি অবসরকালীন সঞ্চয় প্রকল্প। এই স্কিমে কর্মজীবনের সময় নিয়মিত টাকা বিনিয়োগ করা হয়। অবসর গ্রহণের পর সেই অর্থের একটি অংশ একসঙ্গে পাওয়া যায়, আর বাকি অংশ থেকে নিয়মিত পেনশন পাওয়া যায়। সরকারি কর্মীদের পাশাপাশি বর্তমানে বেসরকারি কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকরাও এই স্কিমে বিনিয়োগ করতে পারেন।
২০২৬ সালের বড় পরিবর্তন
২০২৬ সালের সংস্কারের সবচেয়ে বড় দিক হল- সরকারি এবং বেসরকারি সেক্টরের NPS-কে আলাদা কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। এর ফলে দু’টি ভিন্ন ধরনের নিয়ম তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে- সরকারি কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অন্যদিকে- বেসরকারি বা কর্পোরেট কর্মীদের জন্য আরও নমনীয় নিয়ম।
কর্পোরেট NPS-এর পুনর্বিন্যাস
পিএফআরডিএ কর্পোরেট NPS-কেও নতুনভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এখন এটি দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- Government Entities এবং Legal Entities। Government Entities বলতে বোঝানো হচ্ছে- স্ট্যাটুটরি সংস্থা, কেন্দ্রীয় পাবলিক সেক্টর সংস্থা ও রাজ্য সরকারি সংস্থা। অন্যদিকে Legal Entities বলতে বোঝানো হচ্ছে বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থা। এই নতুন কাঠামোর ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও সহজ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
CRA-এর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ
সরকারি সংস্থাগুলিকে এখন সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে Central Recordkeeping Agency বা CRA-এর সঙ্গে। এর ফলে আগে যে মধ্যস্থতাকারী বা PoP-এর মাধ্যমে কাজ করতে হত, সেই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কমানো হচ্ছে। এতে খরচ কমবে এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বেসরকারি কর্মীদের জন্য নতুন নিয়ম
এখন দেখা যাক বেসরকারি বা নন-গভর্নমেন্ট কর্মীদের জন্য কী কী নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। এই নিয়মগুলি মূলত- All Citizen Model, Corporate Sector Model- এর আওতায় থাকা গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য।
৮০:২০ লাম্প সাম নিয়ম
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অবসরের সময় টাকা তোলার নিয়মে। আগে NPS-এ অবসরের সময়- ৬০ শতাংশ টাকা একসঙ্গে তোলা যেত বাকি ৪০ শতাংশ দিয়ে অ্যানুইটি বা পেনশন কিনতে হত। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি কর্মীরা এখন- ৮০ শতাংশ টাকা একসঙ্গে তুলতে পারবেন। আর মাত্র ২০ শতাংশ টাকা দিয়ে অ্যানুইটি কিনতে হবে। এই পরিবর্তন অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য বড় সুবিধা বলে মনে করা হচ্ছে।
ছোট কর্পাসে ১০০ শতাংশ উত্তোলন
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে ছোট কর্পাসের ক্ষেত্রে। যদি কোনও ব্যক্তির NPS অ্যাকাউন্টে মোট সঞ্চয় ৮ লক্ষ টাকা বা তার কম হয়, তাহলে তিনি অবসরের সময় পুরো টাকাই একসঙ্গে তুলতে পারবেন। এর আগে এই সীমা ছিল অনেক কম।
লক-ইন পিরিয়ড বাতিল
বেসরকারি গ্রাহকদের জন্য আরেকটি বড় পরিবর্তন হল- ৫ বছরের লক-ইন পিরিয়ড তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশি নমনীয়তা এসেছে।
বিনিয়োগের বয়সসীমা বাড়ানো
আগে NPS-এ সর্বোচ্চ ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত বিনিয়োগ রাখা যেত। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী এই সীমা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮৫ বছর। অর্থাৎ কেউ চাইলে আরও দীর্ঘ সময় ধরে NPS-এ বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে পারবেন।
ধাপে ধাপে টাকা তোলার সুযোগ
বেসরকারি গ্রাহকদের জন্য আরও একটি নতুন সুবিধা হল- Systematic Withdrawal Option। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা চাইলে ধাপে ধাপে টাকা তুলতে পারবেন। এই পদ্ধতিগুলির মধ্যে রয়েছে- Systematic Unit Redemption এবং Systematic Lump Sum Withdrawal- এর ফলে অবসরকালীন অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হতে পারে।
সরকারি কর্মীদের জন্য নিয়ম
এবার দেখা যাক সরকারি কর্মীদের জন্য কী নিয়ম রয়েছে। সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে কাঠামো তুলনামূলকভাবে আরও নিয়মবদ্ধ রাখা হয়েছে।
৬০:৪০ নিয়ম বজায়
সরকারি কর্মীদের জন্য এখনও পর্যন্ত ৬০:৪০ নিয়মই বজায় রয়েছে। অর্থাৎ অবসরের সময়- ৬০ শতাংশ টাকা একসঙ্গে তোলা যাবে বাকি ৪০ শতাংশ দিয়ে পেনশন নিতে হবে।
১০০ শতাংশ উত্তোলনের সীমা বাড়ানো
আগে যদি কোনও সরকারি কর্মীর NPS কর্পাস ৫ লক্ষ টাকার কম হত, তাহলে তিনি পুরো টাকা তুলতে পারতেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এই সীমা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮ লক্ষ টাকা।
Systematic Unit Redemption
সরকারি কর্মীদের জন্যও নতুনভাবে চালু করা হয়েছে Systematic Unit Redemption বা SUR। এর মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্দিষ্ট পরিমাণ ইউনিট রিডিম করতে পারবেন।
বয়সসীমা বৃদ্ধি
বেসরকারি কর্মীদের মতো সরকারি কর্মীরাও এখন ৮৫ বছর বয়স পর্যন্ত NPS-এ থাকতে পারবেন।
NPS-এ সাধারণ পরিবর্তন
কিছু পরিবর্তন রয়েছে যা সরকারি ও বেসরকারি- উভয় ধরনের গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য।
NPS-এর উপর ঋণ
এখন গ্রাহকরা চাইলে তাদের নিজের অবদান থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এই ঋণ নেওয়া যাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এর জন্য NPS অ্যাকাউন্টের উপর একটি লিয়েন মার্ক করা হবে।
আংশিক উত্তোলন
এছাড়াও NPS থেকে আংশিক টাকা তোলার নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। এখন গ্রাহকরা ৬০ বছরের আগে চারবার পর্যন্ত আংশিক টাকা তুলতে পারবেন। তবে প্রতিবার উত্তোলনের মধ্যে চার বছরের ব্যবধান থাকতে হবে। এই সুবিধা বিশেষ করে- চিকিৎসা ও জরুরি আর্থিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কর সুবিধা
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ থেকে কর সুবিধার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। নতুন কর ব্যবস্থায় এখন- নিয়োগকর্তার অবদান বেতন (বেসিক + ডিএ)-এর ১৪ শতাংশ পর্যন্ত করছাড়যোগ্য। এই সুবিধা এখন সরকারি এবং বেসরকারি উভয় কর্মীর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
কর সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
যদিও বেসরকারি কর্মীরা এখন ৮০ শতাংশ টাকা তুলতে পারবেন, তবে বর্তমানে করমুক্ত অংশ এখনও ৬০ শতাংশ পর্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। অতিরিক্ত ২০ শতাংশের করব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতের বাজেটে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়- ২০২৬ সালের NPS সংস্কার ভারতের অবসরকালীন সঞ্চয় ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বেসরকারি কর্মীদের জন্য আরও নমনীয়তা, সরকারি কর্মীদের জন্য আরও সুসংগঠিত কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিনিয়োগ করার আগে প্রত্যেক গ্রাহকের উচিত নিজের আর্থিক লক্ষ্য ও অবসর পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।