মাত্র চারজন নির্বাচিত সদস্য নিয়েই তৃণমূলের একাংশের সমর্থন এবং নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে মঙ্গলবার মালদা জেলা পরিষদের সভাধিপতি পদে দখল নিল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। হবিবপুর ব্লকের একটি আসন থেকে জয়ী বিজেপির দীপালী বালা মালদা জেলা পরিষদের নতুন সভাধিপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, সমর্থনের প্রতিদান হিসেবে সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল সভাধিপতি লিপিকা বর্মণ ঘোষকে সহকারী সভাধিপতি পদে সমর্থন করে বিজেপি। মঙ্গলবার দিনভর এই নির্বাচন ঘিরে মালদা জেলা পরিষদ চত্বরে চরম উত্তেজনা ও রাজনৈতিক তরজা সৃষ্টি হয়।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল,নিজস্ব সংবাদদাতা
মালদা জেলা পরিষদের মোট ৪৩ জন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে তৃণমূলের ৩৪ জন, কংগ্রেসের ৫ জন এবং বিজেপির ৪ জন সদস্য রয়েছেন। ২০২৩ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে লিপিকা বর্মণ ঘোষ সভাধিপতি এবং এটিএম রফিকুল হোসেন সহকারী সভাধিপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে রাজ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের জেরে তৃণমূলেরই ১৯ জন সদস্য লিপিকা ও রফিকুলের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে অনাস্থা আলোচনার দিন নির্ধারিত হয় ১৭ অগাস্ট। তবে তার আগেই ১৪ অগাস্ট পদত্যাগ করেন লিপিকা ও রফিকুল।
হাইকোর্টের নির্দেশেই গত ৬ অক্টোবর নতুন সভাধিপতি ও সহকারী সভাধিপতি নির্বাচনের দিন চূড়ান্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে মাত্র চারজন সদস্য নিয়ে আসরে নামে বিজেপি। লিপিকা বর্মণ ঘোষ এবং এটিএম রফিকুলের অনুগামী তৃণমূলের ১৫ জন সদস্য বিজেপির সঙ্গে হাত মেলান এবং পরবর্তীতে আরও একদল তৃণমূল সদস্য তাদের শিবিরে যোগ দেন। নিজেদের রণকৌশল নিশ্চিত করতে এই বিদ্রোহীরা শেষ ছয় দিন ধরে পুরাতন মালদার একটি প্রিমিয়াম হোটেলে আশ্রয় নেন।
মঙ্গলবারের ভোটাভুটিতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে মোট ২৪ জন সদস্য বোর্ড গঠনে উপস্থিত থাকলেও, সাগরিকা সরকারের নেতৃত্বে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর ৫ জন সদস্য মাঝপথে অধিবেশন বর্জন করে বেরিয়ে যান। অন্যদিকে, কংগ্রেসের ৫ জন নির্বাচিত সদস্য জেলা পরিষদে হাজিরই হননি। শেষ পর্যন্ত মোট ২৮ জনের সমর্থনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় মালদা জেলা পরিষদের নতুন বোর্ড গঠিত হয়।
এদিকে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সোমবার রাত থেকেই চরমে ওঠে রাজনৈতিক নাটক। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর নির্বাচিত সদস্যরা কিছুদিন বিহারের পাকুড়ে আত্মগোপন করার পর ঝাড়খণ্ড থেকে ট্রেনে মালদা টাউন স্টেশনে নামতেই পুরোনো মামলার অভিযোগে তাঁদের মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জেলা পরিষদের বৈঠকে সভাধিপতি হিসেবে বিজেপির এক সদস্য দীপালী বালার নাম প্রস্তাব করেন এবং অন্য সদস্য তা সমর্থন করেন। কোনও বিকল্প নাম জমা না পড়ায় সর্বসম্মতভাবে দীপালী বালা নতুন সভাধিপতি নির্বাচিত হন। একইভাবে, তৃণমূলের একাংশের প্রস্তাব ও সমর্থনে সহকারী সভাধিপতি হিসেবে নির্বাচিত হন লিপিকা বর্মণ ঘোষ।
মালদা জেলা পরিষদের অতিরিক্ত নির্বাহী আধিকারিক তথা অতিরিক্ত জেলাশাসক ভাস্কর মজুমদার জানান, সর্বসম্মতভাবে দীপালী বালা সভাধিপতি ও লিপিকা বর্মণ ঘোষ সহকারী সভাধিপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দুটি পদের জন্যই মাত্র দুটি নাম প্রস্তাবিত হওয়ায় এবং কোনও বিকল্প নাম না থাকায় তাঁদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী জুয়েল মুর্মু বলেন, মানুষ উন্নয়ন চায়। তৃণমূলের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের কাছে মানুষ উন্নয়ন চেয়েছিল, কিন্তু তা হয়নি। তাই উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচিত সদস্যরা বিজেপির সভাধিপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিজেপির মালদা উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, আমরা কারো সমর্থন চাইনি, কাউকে সমর্থনও করিনি। আমরা সভাধিপতি পদে নাম প্রস্তাব করেছি, বিকল্প প্রস্তাব না আসায় আমাদের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এতে অন্যায়ের কিছু নেই। কেন্দ্রের জাতীয়তাবাদী সরকারের ভাবধারায় এই জেলা পরিষদ মালদার গ্রামীণ অঞ্চলের উন্নয়নে কাজ করবে। সদস্যদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণ পুলিশের বিষয়, অভিযোগ থাকলে পুলিশ আইনগত পদক্ষেপ করতেই পারে।
অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক পালাবদলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা দক্ষিণ মালদার সাংসদ ঈশা খান চৌধুরী বলেন, তৃণমূলের কিছু সদস্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির হাত ধরেছেন। বাংলার মানুষ ও মালদার জনতা তাদের কখনো ক্ষমা করবেন না। কংগ্রেস নেত্রী মৌসম নূর বলেন, জেলা পরিষদ দখলের জন্য তাঁদের দলের কর্মীদের পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করিয়েছে বিজেপি।
একদিকে রাতের অন্ধকারে মালদহ স্টেশনে পুলিশি তৎপরতা। অন্যদিকে সকাল হতেই জেলা পরিষদের ক্ষমতার পালাবদল। তৃণমূলের একাংশকে পাশে নিয়ে বিজেপির জেলা পরিষদ দখল মালদাক রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বড় বার্তা। এখন দেখার, এই পালাবদল জেলা পরিষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে মালদার গ্রাম থেকে পঞ্চায়েত, আর পঞ্চায়েত থেকে গোটা জেলার রাজনীতিতে।