বিজেপি নেত্রী সাধ্বী প্রজ্ঞার মন্তব্যে বিতর্কের ঝড় রাজনৈতিক মহলে।
সন্দীপন চৌধুরী, সাংবাদিক: যে জাতি নারীদের সম্মান দিতে জানে না, তারা কখনও উন্নত হতে পারে না’। এটি স্বামী বিবেকানন্দের একটি বিখ্যাত উক্তি, যা একটি জাতির সার্বিক উন্নয়নে নারীর সম্মান ও মর্যাদার গুরুত্ব কথা বলেছিলেন। এই উক্তিটি বোঝায় যে সমাজে নারীদের প্রতি অসম্মান ও অবজ্ঞা থাকলে সেই জাতির পক্ষে উন্নতি লাভ করা কখনই সম্ভব নয়। স্বামীজী তার অসীম জ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে হয়তো ভবিষ্যতের চিত্র কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, তাই বর্তমান যুগে নারীদের প্রতি অসম্মান ও অবজ্ঞার আভাস পেয়েই, এমন উক্তি করে গিয়েছিলেন।

গত কদিন আগের কথা, দুর্গাপুরের গণধর্ষণ-কাণ্ড নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে রীতিমত হইচই পড়ে গিয়েছিল গোটা রাজনৈতিক মহলে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, অত রাতে কী করছিলেন ওই তরুণী? তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।যা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। রাজ্যের বিরোধীদল বিজেপির তরফে এই নিয়ে দেখা গেল রাজ্য়ের জেলায়-জেলায় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে প্রতিবাদ। যদিও মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন তাঁর বক্তব্যকে বির্কৃত করে পরিবেশন করা হচ্ছে। সেই যাই হোক। বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের নিয়ে আলোচোনা-পর্যালোচনা প্রচুর হয়েছে। কদিনের মধ্য নিউজের হেডলাইন থেকে তা সরেও গেল। ঠিক তখনই তরজা আরও উষ্কে দিলেন ভোপালের প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর। তিনি ভোপালের লাভ জিহাদ বাঁচাও নিয়ে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানী সভা থেকে প্রকাশ্যে মেয়েদের পা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। দেশের সকল বাবা-মায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অ-হিন্দুদের বাড়িতে যাওয়া থেকে ঘরের মেয়েদের বাধা দিন। যদি অ-হিন্দু কোনও মানুষকে বেছে নেয় আপনার মেয়ে তাহলে তাঁদের মেরে পা ভেঙে দিন। যদি আপনার মেয়েরা আপনাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে তাদের শারীরিক শাস্তি পাওয়া উচিত।

যখন ভোপালের প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর বক্তব্য রাখছিলেন, তখন তার পেছন থেকে স্লোগান উঠছে। জয় শ্রী রাম। নারীর সম্মানরক্ষাকে কেন্দ্র করে মহাযুদ্ধে নেমেছিলেন শ্রী রাম। যে রামের উল্লেখ করে এই স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, সেই রামের ভারতভূমির মাটিতেই নারীদের অসম্মান করা হচ্ছে।
ভারতের, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে বিবাহের স্বাধীনতাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই আইন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্করা পরিবার বা সম্প্রদায়ের অনুমোদন ছাড়াই তাদের নিজস্ব সঙ্গী বেছে নিতে পারেন, এবং বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪-র মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় এবং আন্তঃবর্ণ বিবাহের অনুমতি দেয় ভারতের সংবিধান। যেখানে ভারতের সংবিধান দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে নিজের পছন্দের সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার দিচ্ছেন। সেখানে প্রকাশ্যে ভরা সভায় সংবিধানের বিধানকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানালেন প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ। প্রাক্তন বিজেপি সাংসদের এই মন্তব্যকে ধার্মিক ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ তুলছে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি একাংশ। কথার ওপর কথা, তর্ক-বিতর্কের রাজনৈতিক তরজা তো চলতেই থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, স্বাধীনতার ৭৯তম দিবসেও কেন এই নারী বিদ্বেষী মনোভাব? একজন নারী হয়েও, কেন অপর নারীদের প্রতি এই প্রতিবন্ধকতা ? স্বাধীন হয়েও কী পরাধীনতার চাদরে ঢাকা পরে থাকবে, দেশের শিরদাঁড়া দেশের নারী সমাজ। দেশের শিক্ষিত সুস্থ সমাজের কাছ থেকে উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম আমরা।