চন্দ্রনাথের গাড়িটিতে উল্টো দিক থেকে আটকায় একটি গাড়ি। এর পর বাইকে করে দুষ্কৃতীরা তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায়।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : রাজ্যে ভোট-পরবর্তী হিংসার আবহে ফের রক্ত ঝরল। এবার খুন হলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। বুধবার মধ্যমগ্রামের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে মৃত্যু হয় তাঁর। ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলায়।
বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ায় বাইকে করে এসে চন্দ্রনাথের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। গাড়িতে চন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিলেন তাঁর চালক বুদ্ধদেব বেরাও। তাঁদের দু’জনকেই উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে, চিকিৎসকেরা চন্দ্রনাথকে মৃত ঘোষণা করেন। বুদ্ধদেবকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কলকাতার ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রাত ১টার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত।
স্থানীয় সূত্রে খবর, প্রথমে চন্দ্রনাথের গাড়িটি দোহাড়িয়া লেনের ভিতরে ঢোকার সময় উল্টো দিক থেকে একটি গাড়ি তাঁদের রাস্তা আটকায়। এর পর বাইকে করে দুষ্কৃতীরা তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। বাইক আরোহীদের মাথায় হেলমেট ছিল। দু’জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে চন্দ্রনাথের। বুদ্ধদেবের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। যে গাড়িটি দিয়ে তাদের পথ আটকানো হয়েছিল, সেই চার চাকা গাড়িটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাতে শিলিগুড়ির ভুয়ো নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া, কিছু গুলি এবং ব্যবহৃত কার্তুজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ঘটনাস্থল এবং ওই গাড়িটি খতিয়ে দেখেছে ফরেন্সিক দল। তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে এলাকা ঘিরে ফেলা হয়।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, চন্দ্রনাথের বুকের বাঁ দিকে দু’টি গুলি লেগেছে। সিপিআর দিয়েও বাঁচানো যায়নি। মৃত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চন্দ্রনাথের চালক বুদ্ধদেবের তিনটি গুলি লেগেছে। একটি বুকের ডান দিকে, একটি পেটে ও একটি ডান হাতে। তাঁর জ্ঞান ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা করে কলকাতার হাসপাতালে তাঁকে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ফের সরব হয়েছে বিজেপি। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগ উঠছিল। তার মধ্যেই বিরোধী দলনেতার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর খুন রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিল। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। যদিও শাসকদলের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
মঙ্গলবারই ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে কড়া অবস্থান নেয় নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের মুখ্যসচিব, ডিজিপি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নির্দেশ দেয় কমিশন। বিশেষ করে সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে রাজ্যে পালাবদলের পর বিজেপি বিভিন্ন জায়গায় পার্টি অফিস ভাঙচুর সহ একাধিক অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) অবশ্য বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা ওই হিংসার অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, “কোথায় কী ঘটনা ঘটেছে, নির্দিষ্ট করে বলুন। কোন থানা, কোন জেলা—সব তথ্য দিন। আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। ডিজিপির সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ৫০-৬০টি ছোটখাটো অভিযোগ জমা পড়েছে, কিন্তু ব্যাপক হিংসার ছবি তুলে ধরা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।”
উল্লেখ্য, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ফল করেছে বিজেপি। ২০৭টি আসন জিতে প্রথমবারের জন্য বাংলার ক্ষমতায় আসতে চলেছে গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ভবানীপুর কেন্দ্রেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। শনিবার শপথগ্রহণ। কিন্তু নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হতে চলেছেন সেই সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি দলের তরফে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন ও তাদের শপথগ্রহণের আগেই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে খুন করা হল শুভেন্দুর আপ্তসহায়ককে। চন্দ্রনাথ রথের খুনের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল—রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরেও কি থামবে না রক্তপাতের রাজনীতি? প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।