ভোট টানতে নয়া ফন্দি বিজেপির!

রীতিমতো টাকার খেলা বিজেপি শিবিরে। শুধু মাত্র বানাতে হবে রিল। তাহলেই মিলবে কাড়ি কাড়ি টাকা

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। বিজেপি জানে এই নির্বাচনেও হালে পানি পাবে না। এত আস্ফালন এত ঔদ্ধত্য এত অহংকার ভোট বাক্সে গিয়ে একেবারে চুপসে যাবে। সেটা বিজেপি খুব ভালো করে জানে। আর তাই যাতে কিছুটা মান সম্মান থাকে, তাই মরিয়া লড়াই চালাচ্ছে তারা।  

বাংলার মানুষকে তারা স্বপ্ন দেখাচ্ছে যে, এই রাজ্য দখলের ক্ষমতায় এলে নাকি লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা দ্বিগুণ করে দেবে ইত্যাদি সমস্ত প্রতিশ্রুতিই আসলে কথার কথা। কারণ নিজেদের ওপর ভরসা থাকলে এইভাবে অসৎ উপায় অবলম্বন করতে হয় নাকি। বিজেপির হয়ে রিল বানালেই নাকি মিলবে টাকা! আজ্ঞে হ্যাঁ। চাইলে সেই টাকা আপনিও পেতে পারেন যদি আপনি বিজেপির হয়ে প্রচারমূলক রিলস বানান। বিজেপির হয়ে একটা রিল বানালেই মিলবে ২০ হাজার টাকা আর এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ-তরুণীদের টাকার বিনিময়ে দলের হয়ে প্রচারে ব্যবহার করতে চাইছে পদ্ম শিবির। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বঙ্গ বিজেপির এই টাকার বিনিময়ে প্রচার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। প্রশ্ন উঠছে এইভাবে টাকার খেলায় নেমে কি ভোট পাওয়া যায়? এই প্রসঙ্গে বলতেই হচ্ছে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কথা কারণ তারা এখন বিজেপির নজরে আছে আর এদের দিয়েই বাজিমাত করতে চাইছে বিজেপি। বিজেপির তরফে টার্গেট কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একটা বয়সসীমাও স্থির করা হয়েছে বিশেষত নবীন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছনোর জন্য বিজেপি ব্যবহার করছে সোশাল মিডিয়াকে। মূলত কমবয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যাদের মুখ বেশ চেনা তারাই নাকি বিজেপির হাতিয়ার। তারাই নাকি মুখ রক্ষা করবে আর তাই জেতার মরিয়া চেষ্টায় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের পিছনে টাকা ঢালছে বিজেপি। কিন্তু কীভাবে দলের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন? যারা প্রচার করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য একটি লিংক দেওয়া হচ্ছে। সেখানে গিয়ে ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। ইনস্টাগ্রামে রিল পিছু প্রচারের বাজেট রাখা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। সমাজমাধ্যমে বিজেপির হয়ে কনটেন্ট তৈরি করলে এই ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। তবে যাঁদের এই প্রচারে টাকা দেওয়া হবে তাঁদের আবার শর্তও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কমপক্ষে ১৫ হাজার ফলোয়ার্স থাকতে হবে ইনস্টাগ্রামে। গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার ভিউ থাকতে হবে। বিজেপির হয়ে প্রচার মূলত পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক হতে হবে। যেটা না বললেই নয়, দেশের যুবদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কেরিয়ার গড়তে সুযোগ করে দিতে কেন্দ্রীয় বাজেটে ১০ হাজার কোটির বিশেষ বরাদ্দর ঘোষণা করেছেন নির্মলা সীতারামন। এখন অনেকেই অ্যানিমেশন, গেমিং-সহ এই ধরনের নানা বিষয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েট করে টাকা রোজগার করেন। তাই বাজেট পেশের সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী জানান, মুম্বইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিস-এর সহায়তায় দেশের ১৫,০০০টি মাধ্যমিক স্কুল এবং ৫০০টি কলেজে এভিজিসি অর্থাৎ, অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, গেমিং ও কমিক্স ল্যাব স্থাপন করা হবে। এছাড়াও দেশের স্কুল ও কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। আসলে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের হাত ধরে অর্থ উপার্জনের নয়া দিগন্ত খুলেছে। তাই এই ক্ষেত্রটিকে কাজে লাগিয়েই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার কথা ভাবছে সরকার। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন কন্টেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। তবে এই পেশায় টিকে থাকতে প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকাও জরুরি। ঠিক সেই বিষয়টিতেই জোর দিতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রযুক্তির সাহায্য সৃজনশীল শিল্পসৃষ্টির প্রাথমিক পাঠ যাতে স্কুল-কলেজ থেকে পেতে পারে শিক্ষার্থীরা, তেমনই পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকারের। আর এই কারণেই ভোট টানতেও এবার সেই কনটেন্ট ক্রিয়েশোনকেই কাজে লাগানোর চিন্তা বিজেপির তবে এক্ষেত্রে মানতে হবে বেশ কিছু শর্ত। রিলসে তুলে ধরতে হবে বিজেপির কাজের খতিয়ান, শুধু রিলস বানালেই হবে না, তাকে যথাযথভাবে শেয়ার করতে হবে, কোন উস্কানিমূলক কথা বলা যাবে না। যে ফলোয়ার চাওয়া হয়েছে তার কম হলে হবে না। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিতেই হবে  এবং অন্য কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করা যাবে না। একা বিজেপিই নয় এর আগে তৃণমূলও এই পথে হেঁটেছিল। ডিজিটাল দুনিয়ায় সেনা নামাতে তৃণমূলে নতুন কর্মসূচি চালু করেছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্মসূচির পোশাকি নাম ‘আমি বাংলার ডিজিটাল যোদ্ধা’। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ডিজিটাল মাধ্যমে দলের উপস্থিতি আরও শক্তপোক্ত করতেই এই কর্মসূচির ঘোষণা করেছে তৃণমূল। ‘আমি বাংলার ডিজিটাল যোদ্ধা’ নামে একটি ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। যাঁরা নিজেদের নাম ‘যোদ্ধা’ হিসাবে নথিভুক্ত করবেন, তাঁদের নাম, ফোন নম্বর, জেলা এবং বিধানসভা কেন্দ্রের নাম সেখানে জানাতে হবে। তৃণমূল জানিয়েছে, ওয়েবসাইট চালু হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর দেখা গিয়েছে, ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিজের নাম নথিভুক্ত করেছেন সেখানে। যাকে ‘বিরাট সাড়া’ বলেই মনে করছে শাসকদল। বুথ পিছু অন্তত ১০ জনকে ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যাঁরা মোবাইলে স্বাচ্ছন্দ্য, প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রয়েছে, রাজনৈতিক যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন, তেমন তরুণ-তরুণীদেরই ‘যোদ্ধা’ করতে চাইছে ক্যামাক স্ট্রিট। যদিও প্রচারের সময় সকলকেই আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে অভিষেক যে নবীন এবং তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে কাজ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, সে ইঙ্গিত তাঁর কথায় আগেও বহু বার মিলেছে। ভিডিয়ো তৈরি করা, গ্রাফিক্সে পারদর্শী এমন ‘যোগ্যতা’য় ‘যোদ্ধা’ হওয়া যাবে তৃণমূলের। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের তফাত বরাবরই ছিল আছে এবং থাকবে, বিজেপি টাকা দিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কিনতে চাইছে, কিন্তু রাজ্যের শাসকদল কখনই সেই রাস্তায় হাঁটেনি।