‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক

ফলতায় বিজেপির রেকর্ড জয়, দ্বিতীয় স্থানে সিপিএম; চতুর্থে তৃণমূল

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনে প্রত্যাশামতোই বড়সড় জয় ছিনিয়ে নিল বিজেপি। তবে শুধু জয় নয়, এবারের ফলাফল কার্যত এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিল রাজ্যের রাজনীতিতে। বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা যেমন নিজের শক্তির প্রমাণ দিলেন, তেমনই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠল তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি। একসময় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফলতায় এবার ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী জাহাঙ্গির খান চতুর্থ স্থানে শেষ করলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আর সেই ফলাফল ঘিরেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বহুচর্চিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’।
রবিবার সকাল থেকেই ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শুরু হয় ভোট গণনা। গণনাকেন্দ্র ঘিরে ছিল বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মোতায়েন ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ। সকাল থেকে গণনাকেন্দ্রের বাইরে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের ভিড় থাকলেও প্রশাসনের তরফে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হয় যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
মোট ১৯টি টেবিলে শুরু হয় গণনা প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মোট ২২ রাউন্ডে ভোটগণনা সম্পন্ন হয়। শুরু থেকেই বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে থাকতে শুরু করেন। প্রথম কয়েক রাউন্ডের লিড যত এগোয়, ব্যবধানও তত বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, মধ্যাহ্নের আগেই কার্যত স্পষ্ট হয়ে যায় যে ফলতায় বিজেপির জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা।
চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা পেয়েছেন ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৬৬৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসেন সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি। তিনি পান ৪০ হাজার ৬৪৫ ভোট। ফলে বিজেপি প্রার্থী প্রায় ১ লক্ষ ৯ হাজার ২১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। রাজনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণবঙ্গের কোনও বিধানসভা পুনর্নির্বাচনে এত বড় ব্যবধান বিরল ঘটনা।
এবারের নির্বাচনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সিপিএমের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের রাজনীতিতে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা বাম শিবিরের কাছে এই ফল কিছুটা হলেও রাজনৈতিক অক্সিজেন হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি তুলনামূলকভাবে কম সময় প্রচার করেও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা তৃণমূলের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বাম কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা পেয়েছেন ১০ হাজার ৮৪ ভোট। যদিও লড়াইয়ে তিনি বড় ভূমিকা নিতে পারেননি, তবুও তৃণমূলকে পিছনে ফেলে বিরোধী ভোটের সমীকরণে তাঁর অবস্থান কিছুটা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।


সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের প্রার্থী জাহাঙ্গির খান মাত্র ৭ হাজার ৭৮৩ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে শেষ করেন। এই ফলাফল শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেও মনে করা হচ্ছে। কারণ, একসময় ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রকে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হতো। স্থানীয় রাজনীতিতে জাহাঙ্গির খানের প্রভাবও দীর্ঘদিনের। অথচ এবার সেই জাহাঙ্গির খানই কার্যত ভরাডুবির মুখে পড়লেন।
রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ভোট গণনাকেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের এজেন্ট না থাকার বিষয়টি। বিরোধীদের দাবি, ভোটের ফল নিয়ে আগাম আশঙ্কা থেকেই তৃণমূল কার্যত মাঠ ছাড়ে। যদিও এ বিষয়ে তৃণমূলের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। রাজনৈতিক মহলের একাংশ অবশ্য মনে করছে, সংগঠনগত দুর্বলতা এবং স্থানীয় স্তরে জনসংযোগের ঘাটতি এই ভরাডুবির অন্যতম কারণ হতে পারে।
এই ফল প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছে তথাকথিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’। দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল নেতৃত্ব দাবি করে এসেছে যে ডায়মন্ড হারবার এলাকায় উন্নয়ন, প্রশাসনিক কাজ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতে একটি সফল মডেল তৈরি হয়েছে। কিন্তু ফলতার এই ফলাফল সামনে আসার পর বিরোধী দলগুলি সেই দাবিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিজেপির দাবি, ফলতার মানুষ এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে তাঁরা সন্ত্রাস, ভয়ভীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ চান।


জয়ের পর বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা বলেন, “এই জয় কোনও ব্যক্তির জয় নয়, ফলতার মানুষের জয়। ফলতার মানুষ দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছে। এতদিন মানুষ ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে ছিল। এবার মানুষ নিজের ভোট নিজের মতো করে দিতে পেরেছে। ডায়মন্ড হারবার মডেল বলে যা প্রচার করা হতো, তা আসলে হিংসা ও সন্ত্রাসের মডেল। মানুষ তার জবাব দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিপুল সমর্থন আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল। মানুষের পাশে থেকে উন্নয়নমূলক কাজ করাই এখন মূল লক্ষ্য হবে।”
অন্যদিকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি বলেন, “ফলতায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসের পরিবেশ ছিল। আমিও বাড়িছাড়া ছিলাম। খুব সীমিত সময় প্রচার করতে পেরেছি। তবুও মানুষ আমাদের উপর আস্থা রেখেছেন। আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা আরও সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করব। মানুষ হিংসা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।”
তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। ফোনও ধরেননি তিনি। ফলে এই ভরাডুবি নিয়ে দলের অবস্থান এখনও স্পষ্ট হয়নি।
এদিকে সকাল থেকেই গণনাকেন্দ্রের বাইরে উৎসবের আবহ তৈরি হয় বিজেপি শিবিরে। গেরুয়া আবির, ঢাক-ঢোল এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের ভিড় বাড়তে থাকে দুপুরের পর থেকেই। উপস্থিত ছিলেন বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো-সহ একাধিক বিজেপি বিধায়ক ও নেতা। ফলাফল ঘোষণা হতেই সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে সরগরম হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলতার এই ফলাফল শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্রের জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচন ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াইয়ে এই ফল যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে, তা বলাই যায়। ফলতার মানুষ যে এবার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।