হাদি হত্যায় নদিয়ায় জালে দালাল

নতুন করে গ্রেফতার আরও এক বাংলাদেশি নাগরিক ফিলিপ সাংমা। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স নদিয়ার শান্তিপুর বাইপাস সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁকে আটক করেছে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজৈনতিক অস্থিরতার পটভূমিতে আবারও সামনে এল এক বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের নতুন মোড়। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় মুখ ওসমান হাদির হত্যাকে ঘিরে শুরু থেকেই উত্তেজনা ও জল্পনা দিল দুই বাংলাতেই। সেই ঘটনাতেই এবার নতুন করে গ্রেফতার আরও এক বাংলাদেশি নাগরিক ফিলিপ সাংমা। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স নদিয়ার শান্তিপুর বাইপাস সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁকে আটক করেছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওসমান হাদি হত্যার পর মূল অভিযুক্তদের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন এই ফিলিপ সাংমাই। টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট টালমাটাল। আর সেই সময়েই ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক। ৩২ বছরের তরুণ নেতা ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, মোটরবাইকে করে আসা দুই দুষ্কৃতী হাদিকে লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি চালিয়ে দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষমেশ তাঁর মৃত্যু হয়। তরুণ এই ছাত্রনেতার মৃত্যুতে তোলপাড় শুরু হয় গোটা বাংলাদেশে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক মহল হাদি হত্যার দ্রুত বিচার দাবি করে আন্দোলনে নামে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও ঢাকার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্তে নেমে দ্রুতই কয়েকজন সন্দেহভাজনের নাম সামনে আনে। পরে যে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়, তাতে ফয়জল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে এই হত্যাকাণ্ডেক মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অভিযোগ, ঘটনার পরপরই তাঁরা দেশে ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করেন। তদন্তে জানা যায়, মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে অবৈধভাবে ভারতে ঢুকে পড়েছিলেন তারা। এরপর কয়েকদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকার পর পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে বেঙ্গল এসটিএফ তাঁদের গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজনেই ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা যায়।

এই জেরাতেই সামনে আসে আর এক গুরুত্বপূর্ণ নাম ফিলিপ সাংমা। তদন্তকারীদের দাবি, হাদি হত্যার পর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পালাতে ফয়জল ও আলমগীরকে সাহায্য করেছিলেন তিনিই। বাংলাদেশে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকায় বসবাসকারী ফিলিপ দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ। জেরায় তিনি জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ থেকে মেঘালয়ের ডালুপাড়া সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে যাতায়াত করানোই ছিল তাঁর কাজ। ফয়জল ও আলমগীরকেও একইভাবে সীমান্ত পার করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। যার জন্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু হাদি হত্যার তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই বাংলাদেশে চাপ বাড়তে থাকে সংশ্লিষ্টদের উপর। পুলিশের তাড়া শুরু হতেই ফিলিপ সাংমাও নিজেকে নিরাপদ রাখতে সীমান্তে পেরিয়ে ভারতে চলে আসেন। তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, গত কয়েকদিন ধরে তিনি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এবং বারবার নিজের আশ্রয়ের জায়গা বদলাচ্ছিলেন যাতে সহজে ধরা না পড়েন। তবে শেষ পর্যন্ত গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার ভোরে শান্তিপুর বাইপাস সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। পুলিশি জেরায় ফিলিপ সাংমা স্বীকার করেছেন যে দীর্ঘদিন ধরে তিনি অবৈধ সীমান্ত পারাপারের দালালি করতেন। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, হাদি হত্যার পর অভিযুক্তদের পালাতে সাহায্য করার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় তিনিও ভারতে পালিয়ে আসেন। সম্প্রতি আবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা আর সফল হয়নি। গ্রেফতারের পর তাঁকে আদালতে পেশ করা হলে আদালত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।

এই ঘটনার পর নতুন করে নড়চড়ে বসেছে কূটনৈতিক মহলও। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি জানার পর তারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ধৃতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কলকাতা পুলিশের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কনস্যুলার অ্যাক্সেস আবেদনও জানানো হয়েছে নয়াদিল্লির কাছে। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখন দুই দেশের আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরে। ইতিমধ্যেই ফয়জল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসনকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণণের দাবি জানিয়েছে সেদেশের সরকার। তদন্তকারীদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও বড় কোনও চক্র রয়েছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তরুণ ছাত্রনেতার হত্যার রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত তদন্ত যে থামছে না তা স্পষ্ট। আর সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে গেলেও অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না এই বার্তাই যেন আবার সামনে এল এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে।