আক্রান্ত বিএসএফ, থমথমে বক্সনগর সীমান্ত

ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তে কর্তব্যরত বিএসএফ জওয়ানদের উপর হামলা, অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ও তার পরবর্তী সময়ে একের পর এক গ্রেফতারি। ত্রিপুরার সিপাহিজলা জেলার বক্সনগরের আশাবাড়ি গ্রামের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জওয়ানদের উপর এমন হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এবার সেই ঘটনার তদন্তে আরও বড় পদক্ষেপ করল পুলিশ। একদিকে বিএসএফের উপর হামলার ঘটনায় নতুন করে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে অন্যদিকে এই ঘটনার প্রতিবাদ ও তা নিয়ে স্থানীয় স্তরে তৈরি হওয়া বিতর্কের জেরে গোমতী জেলার উদয়পুরে এক প্রবীণ নাগরিক আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ। পরপর এই দুই ঘটনায় ত্রিপুরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

প্রথমেই আসা যাক আশাবাড়ির ঘটনায়। গত ২ নভেম্বর ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন আশাবাড়ি এলাকায় বিএসএফের জওয়ানদের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে একদল স্থানীয় বাসিন্দা ও চোরাকারবারির বিরুদ্ধে। অভিযোগ, চোরাচালান সংক্রান্ত একটি ঘটনার তদন্ত ও অভিযানের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর কর্তব্যরত বিএসএফ জওয়ানদের উপর অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। শুধু মারধরই নয়, তাঁদের ব্যবহৃত অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনায় বিএসএফের একাধিক জওয়ান আহত হন। এমনকী বিএসএফের গাড়িও ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়েই তৎপর হয় কলমচৌড়া থানার পুলিশ। শুরু হয় অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া।

এই ঘটনায় তদন্তে নেমে প্রথম দফায় গত ৩ নভেম্বর মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের আদালতে পেশ করা হলে অভিযুক্তদের একাংশকে পুলিশ হেফাজত এবং বাকিদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি তদন্ত। ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত, হামলার পিছনে কোনও সংগঠিত চক্রের ভূমিকা রয়েছে কি না, কিংবা এই ঘটনার নেপথ্যে আরও কারা মদত জুগিয়েছে, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত চালিয়ে যায় পুলিশ। এরপর নতুন করে অভিযান চালিয়ে আরও আটজনকে গ্রেফতার করে কলমচৌড়া থানার পুলিশ। ধৃতদের শুক্রবার সিপাহিজলা জেলা ও দায়রা আদালতে পেশ করা হয়। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানিয়েছিল পুলিশ। তবে আদালত আটজনকেই আট দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। ফলে আশাবাড়িতে বিএসএফ জওয়ানদের উপর হামলার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮। এই মামলায় মোট ১৯ জনের নাম এফআইআরে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজেও তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সরকারি আইনজীবী গৌতম গিরি। পুলিশের তরফেও জানানো হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেককে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, ত্রিপুরার পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও তার সঙ্গে যুক্ত অপরাধমূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহাও এই ঘটনার পর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন।

আশাবাড়ির এই ঘটনা শুধু সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার প্রশ্নই সামনে আনেনি এর প্রভাব পড়েছে রাজ্যের অন্য প্রান্তেও। এবার আসা যাক গোমতী জেলার উদয়পুরের ঘটনায়। সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন মাখন দাস নামে এক প্রবীণ নাগরিক। তাঁর বয়স ৮৬ বছর। তিনি জামজুরি মুড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। কীভাবে ঘটল এই ঘটনা? আশাবাড়িতে বিএসএফ জওয়ানদের উপর হামলার ঘটনা নিয়ে জামজুরি মুড়াপাড়ার একটি চায়ের দোকানে কয়েকজনের মধ্যে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনায় বক্সনগরের বিধায়ক তোফাজ্জল হোসেনকে নিয়েও কিছু মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ। মাখন দাস সেই মন্তব্যের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিএসএফের উপর হামলার ঘটনার সঙ্গে বিধায়ককে জড়িয়ে দেখা উচিত নয়। কারণ ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বচসা শুরু হয় বলে অভিযোগ।

এরপর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জামজুরি বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে মুরাপাড়া পঞ্চায়েত অফিসের কাছে তাঁকে ঘিরে ধরে কয়েকজন বলে অভিযোগ। মাখন দাসের অভিযোগ, আলফু মিয়া ও তাঁর ছেলেরা তাঁর উপর হামলা চালান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁর চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে আসেন। এরপর তাঁকে উদ্ধার করে গোমতী জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। আক্রান্ত প্রবীণ নাগরিক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। কাকড়াবন থানার পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়ে ঘটনার তদন্তের আবেদনও করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মাখন দাসের উপর হামলার ঘটনাটি আশাবাড়ির হামলার সরাসরি অংশ নয়। স্থানীয় একটি আলোচনা ও বিধায়ককে নিয়ে মন্তব্যের বিরোধ থেকেই এই হামলার সূত্রপাত বলে আক্রান্তের অভিযোগ। ফলে দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারা এই হামলায় জড়িত, কী কারণে তাঁকে আক্রমণ করা হল এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা, সবটাই খতিয়ে দেখা জরুরি।